সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ২০২৫ সালে এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যে ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল, তা মূলত তারই প্রত্যক্ষ ও কঠোর হস্তক্ষেপের কারণে বন্ধ হয়েছিল।
তার দাবি, পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল, তখন তিনি উভয় দেশের ওপর সর্বোচ্চ ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক বাণিজ্য শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। এই নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপের মুখেই বাধ্য হয়ে নয়াদিল্লি এবং ইসলামাবাদ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
তবে বিশ্বশান্তি রক্ষায় এত বড় একটি ভূমিকা পালন করার পরও সম্মানজনক নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ায় তিনি গভীর আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। গত শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চাঞ্চল্যকর দাবিগুলো তুলে ধরেন।
আগামী ৩ নভেম্বর দেশটিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজের কূটনৈতিক সাফল্য এবং শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ভোটারদের সামনে তুলে ধরার অংশ হিসেবে তিনি আটটি ভিন্ন ভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত ও যুদ্ধ সমাধানের কৃতিত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
তার এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দাবির সঙ্গে ভারত সরকার ও তাদের সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের সুস্পষ্ট এবং কাঠামোগত পার্থক্য রয়েছে।
ফ্লোরিডার ওই সমাবেশে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নিজের সাফল্যের ফিরিস্তি তুলে ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি নিজ উদ্যোগে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দুটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশকে একটি নিশ্চিত ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
তার মতে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রথাগত আলোচনার চেয়ে অর্থনীতি এবং বাণিজ্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা অনেক বেশি কার্যকর। তিনি বলেন, সংঘাত চলাকালীন তিনি উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরাসরি সতর্ক করে দিয়েছিলেন।
তিনি তাদের স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, যদি তারা এই সামরিক সংঘাত অব্যাহত রাখে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল বাজারের সঙ্গে তারা আর কোনো ধরনের বাণিজ্য করতে পারবে না এবং তাদের বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক আয় চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
নিজের সেই হুমকির বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, তিনি উভয় দেশের ওপর একযোগে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেছিলেন। তার এই কঠোর বার্তার কারণে উভয় দেশের নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল যে, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তাদের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়বে।
ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন প্রশাসনের এই নজিরবিহীন কঠোর অবস্থানে ভারত ও পাকিস্তান অত্যন্ত বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের পিছু হঠতে হয় এবং তারা একে অপরের দিকে গুলি চালানো বন্ধ করে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণে অর্থনৈতিক চুক্তি এবং শুল্ক নীতিকে তার অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন, যা তার এই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্বশান্তি রক্ষায় এত বড় অবদান রাখার পরও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার বিষয়টি ট্রাম্পকে হতাশ করেছে। সমাবেশে তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে প্রশ্ন রাখেন যে, তিনি কি এই যুগান্তকারী কাজের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন?
এই প্রশ্নের জবাব তিনি নিজেই প্রদান করেন এবং জানান যে তাকে এই সম্মাননা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ট্রাম্পের মতে, বিশ্বজুড়ে আটটি ধ্বংসাত্মক সংঘাতের সফল অবসান ঘটানোর পরও নোবেল কমিটি তার অবদানকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে, যা তার দৃষ্টিতে অত্যন্ত অন্যায্য।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই দাবির প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের মে মাসের দিকে। ওই বছরের শুরুতে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর একটি ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাসী হামলা সংঘটিত হয়।
এই হামলার জন্য নয়াদিল্লি সরাসরি পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং এর মোক্ষম জবাব দেওয়ার জন্য সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৭ মে ভারতীয় সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সিন্দুর’ নামক একটি অত্যন্ত গোপন ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযান শুরু করে।
এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সন্ত্রাসী অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষণ শিবিরগুলো ধ্বংস করে দেওয়া। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, ‘অপারেশন সিন্দুর’ ছিল একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক পদক্ষেপ।
এই অভিযানে ভারতীয় বাহিনী সফলভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে এই সরাসরি সামরিক সংঘাত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল, কারণ যেকোনো ছোট স্ফুলিঙ্গ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা ছিল।
পুরো বিশ্ব যখন চরম উৎকণ্ঠায় দিন পার করছিল, ঠিক তখনই ১০ মে ভারত আকস্মিকভাবে তাদের এই সামরিক অভিযান স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন যে, তার শুল্ক আরোপের হুমকির কারণেই এই যুদ্ধ বন্ধ হয়েছিল।
কিন্তু ভারত সরকার বরাবরই তাদের দ্বিপাক্ষিক যেকোনো ইস্যুতে, বিশেষ করে কাশ্মীর বা পাকিস্তানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে তৃতীয় কোনো দেশের বা পক্ষের মধ্যস্থতার বিষয়টি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
নয়াদিল্লির আনুষ্ঠানিক ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো পরাশক্তির বিন্দুমাত্র চাপ বা প্রভাব ছিল না। ভারত সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে যে, ‘অপারেশন সিন্দুর’ চলাকালে তাদের সামরিক বাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তারাই প্রথম যোগাযোগের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
ভারতের প্রতিরক্ষা বিষয়ক মুখপাত্রদের মতে, ওই সময় পাকিস্তানের ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি অপারেশনস (ডিজিএমও) হটলাইনের মাধ্যমে তার ভারতীয় সমকক্ষের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ স্থাপন করেন।
পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সংঘাত এড়াতে এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে ভারতীয় বাহিনীকে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। মূলত পাকিস্তানের সেই আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এবং নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জিত হওয়ায় ১০ মে ভারত অভিযান স্থগিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বলে নয়াদিল্লি দাবি করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই বক্তব্য মূলত আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তার একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল। মার্কিন ভোটারদের কাছে নিজেকে একজন দৃঢ়চেতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম বিশ্বনেতা হিসেবে প্রমাণ করার জন্যই তিনি ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের এই ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে এসেছেন।
তবে তার এই বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্কে কোনো নতুন অস্বস্তি তৈরি করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ, ভারত কখনোই তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বা দ্বিপাক্ষিক সংঘাতে আন্তর্জাতিক শক্তির খবরদারি পছন্দ করে না।
শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই দাবির সত্যতা যাই হোক না কেন, এটি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে একটি বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার অন্যতম প্রধান খোরাক হয়ে থাকবে।