এই জোটের পক্ষ থেকে ভারতের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগের জোরালো দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। এই দাবির সমর্থনে এবং নির্বাচন কমিশনের কথিত পক্ষপাতমূলক আচরণের প্রতিবাদে আগামী ১ নভেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে এক বিশাল ও সর্বাত্মক বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এটি হতে চলেছে অন্যতম বৃহৎ এক রাজনৈতিক জমায়েত। আয়োজকদের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচিতে কমপক্ষে দশ লাখ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সফল হলে তা ভারতের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে পরিগণিত হবে।
রোববার ভারতের অন্যতম শীর্ষ ও নির্ভরযোগ্য বার্তাসংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) এবং স্বনামধন্য গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-এর প্রকাশিত একাধিক বিস্তৃত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনে মূলত ইনডিয়া জোটের অন্যতম প্রধান এবং নেতৃত্বদানকারী শরিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হরিয়ানা রাজ্য শাখার শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সুনির্দিষ্ট বক্তব্যের বরাত দেওয়া হয়েছে। হরিয়ানা রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি রাও নরেন্দ্র সিং এবং দলের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় দত্ত গণমাধ্যমের সামনে তাদের জোটের এই কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান এবং আসন্ন সমাবেশের বিস্তারিত রূপরেখা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
তারা দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই হলো তার অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা। আর এই ব্যবস্থার প্রধান চাবিকাঠি হলো ভোটার তালিকার নিখুঁত শুদ্ধতা, সম্পূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দেশের প্রতিটি যোগ্য নাগরিকের পবিত্র ভোটাধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হতে না দেওয়া।
তাদের মতে, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের স্বার্থ নয়, বরং ভারতের মতো বিশাল গণতান্ত্রিক দেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এটি অপরিহার্য একটি শর্ত। আর ঠিক এই জায়গাতেই কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আপস করতে কংগ্রেস তথা ইনডিয়া জোট একেবারেই প্রস্তুত নয় বলে তারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন।
কংগ্রেস এবং বিরোধী জোট ইনডিয়ার শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত জোরালো দাবি করা হয়েছে যে, তাদের দীর্ঘদিনের দেশব্যাপী প্রতিবাদী আন্দোলন ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ কর্মসূচি এখন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।
এই আন্দোলনকে তৃণমূল পর্যায়ে সফল করার জন্য ব্যাপক মাত্রায় সাংগঠনিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে হরিয়ানা রাজ্যের প্রতিটি জেলা, প্রতিটি প্রশাসনিক এলাকা, প্রত্যন্ত গ্রাম এবং একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিটি ভোটগ্রহণ কেন্দ্র পর্যন্ত এই গণজাগরণমূলক কর্মসূচি পৌঁছে দেওয়ার জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের কঠোর নির্দেশিকা প্রদান করা হয়েছে।
মূলত জনগণকে তাদের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো সাধারণ মানুষের সামনে উন্মোচন করাই এই বিস্তৃত সাংগঠনিক প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
পিটিআই-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে হরিয়ানা কংগ্রেসের দুই শীর্ষ নেতা রাও নরেন্দ্র সিং এবং সঞ্জয় দত্ত দলীয় প্রস্তুতির একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেছেন। তারা জানিয়েছেন যে, কংগ্রেসের প্রতিটি স্তরের নেতা ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের প্রতি দলের হাইকমান্ড থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই নির্দেশের আওতায় কর্মীদের প্রধান কাজ হবে বর্তমান ভোটার তালিকায় থাকা সম্ভাব্য যাবতীয় গরমিল, অসামঞ্জস্যতা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ত্রুটিগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চিহ্নিত করে তা নথিবদ্ধ করা। একই সঙ্গে, যেসব যোগ্য ভোটার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন, তাদের অধিকার সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া।
এর পাশাপাশি আগামী ১ নভেম্বরের ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানের সমাবেশে যাতে হরিয়ানা রাজ্য থেকে সব স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও বিপুল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে রাতদিন এক করে কাজ করার জন্য নেতা-কর্মীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, আগামী ১ নভেম্বর রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে অনুষ্ঠিতব্য ‘ইনডিয়া’ জোটের এই বিশাল জনসমাবেশটিকে তাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ‘দিল্লি চলো’ অভিযানের একটি চূড়ান্ত এবং চরম পর্যায় হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের দৈনন্দিন কার্যপদ্ধতিতে ব্যাপক মাত্রায় অনিয়ম, প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব এবং বিশেষ করে ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ প্রক্রিয়ার নামে যে অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে, তার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই এই কঠোর অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছে।
ইনডিয়া জোটের দাবি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন তার নিরপেক্ষতার পবিত্রতা রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই গোটা পরিস্থিতিকে ‘ভোট চুরি’ নামক একটি জঘন্য গণতান্ত্রিক অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছে।
দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, জনগণের রায়কে পরিকল্পিতভাবে ছিনতাই করার যে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে, তার প্রতিবাদে আয়োজিত ১ নভেম্বরের এই বিশাল সমাবেশ সমগ্র জাতির সামনে গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার ক্ষেত্রে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ইস্পাতকঠিন ঐক্যের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা প্রদান করবে।
কংগ্রেস মনে করে, দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো যখন হুমকির মুখে, তখন জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই পারে স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতাকে প্রতিহত করতে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি এবং অত্যন্ত গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন হরিয়ানা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় দত্ত।
তিনি তার বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভারতের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের অন্যতম প্রধান এবং অবিচ্ছেদ্য সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো যেকোনো মূল্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা।
তিনি আরও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি সময়ে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে যেসব গুরুতর গরমিল এবং অনিয়মের অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে, তা কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বহু যোগ্য নাগরিকের নাম তালিকা থেকে সুকৌশলে বাদ পড়ার যে তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিমূলকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এই অভিযোগগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সঞ্জয় দত্ত এবং রাও নরেন্দ্র সিং তাদের যৌথ বক্তব্যে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, কংগ্রেস এবং বিরোধী জোট গভীরভাবে বিশ্বাস করে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার স্বীয় পদে বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা এই গুরুতর প্রশ্নগুলোর কোনো সুষ্ঠু ও যথাযথ সমাধান বা নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
কারণ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি শীর্ষ পদে আসীন থাকলে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত হওয়াই স্বাভাবিক। ঠিক এই যুক্তিতেই নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে তাকে অবিলম্বে অপসারণ করা একান্ত জরুরি বলে তারা মনে করেন।
এখানেই থেমে না থেকে তারা আরও একধাপ এগিয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তে যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভারতের পবিত্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্রের জন্য বা নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো আইন লঙ্ঘনের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী বা দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তাকে তার পদ থেকে শুধু অপসারণই নয়, বরং তাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করাসহ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের শেষাংশে সঞ্জয় দত্ত ভারতের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে এক আবেগঘন অথচ অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর বার্তা প্রদান করেন। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হলো সেই রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তি ও প্রাণভোমরা।
প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার রক্ষা করার অর্থই হলো প্রকারান্তরে দেশের পবিত্র সংবিধান এবং জনগণের স্বাধীন রায়কে সযত্নে রক্ষা করা। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, ইনডিয়া জোটের বর্তমান এই রাজপথের লড়াই কেবল কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতা বা কোনো একটি দলের ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়।
বরং এই নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম হলো ভারতের প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের সেই অলঙ্ঘনীয় সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার এক বৃহত্তর আন্দোলন-যে অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তারা একটি সম্পূর্ণ অবাধ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিজেদের পছন্দমতো সরকার বেছে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। জনগণের এই ক্ষমতাকে কোনো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।