সোমবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫
১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বৈশ্বিক বিভক্তির আবহে বাণিজ্য সুবিধার অংশীদারিত্বে জোর এশীয়-প্রশান্ত নেতাদের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৫, ১১:৩২ এএম

বৈশ্বিক বিভক্তির আবহে বাণিজ্য সুবিধার অংশীদারিত্বে জোর এশীয়-প্রশান্ত নেতাদের
ছবি: AFP

বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান বিভাজন এবং তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার এক অন্ধকার ছায়ার নিচে শেষ হলো এশিয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা (অ্যাপেক) ফোরামের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন। শনিবার দক্ষিণ কোরিয়ার ঐতিহাসিক গিয়ংজু শহরে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের সমাপনী দিনে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নেতারা বাণিজ্যে "স্থিতিস্থাপকতা এবং অংশীদারিত্বমূলক সুবিধা" নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছেন।

 

তবে, এই ঐক্যের আহ্বান এমন এক সময়ে এলো, যখন ফোরামের সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতি এবং তার অনুসৃত আগ্রাসী অর্থনৈতিক কৌশলগুলোই সম্মেলনের মূল ભાવনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চলতি বছর অ্যাপেক সম্মেলনের আয়োজক দেশ ছিল দক্ষিণ কোরিয়া, যার প্রেসিডেন্ট লি জে মায়ুং বিশ্বনেতাদের স্বাগত জানান। কিন্তু এই আয়োজনটি শুরু থেকেই মার্কিন শুল্ক এবং চীনা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো বৈরী অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কারণে সৃষ্ট চাপের মধ্যে ছিল।

 

বৈশ্বিক বাণিজ্য আদেশের এই গভীর ফাটলগুলোই ছিল গিয়ংজু সম্মেলনের প্রধান আলোচ্যসূচি। নেতারা যখন "অংশীদারিত্বমূলক সুবিধা" নিয়ে আলোচনা করছিলেন, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ভিন্নধর্মী কূটনৈতিক পদক্ষেপ এই বহুপাক্ষিক ফোরামের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শীর্ষ সম্মেলন শুরু হওয়ার আগেই দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ঘোষণা দেন। কিন্তু মূল শীর্ষ সম্মেলন, যেখানে সব নেতার বহুপাক্ষিক আলোচনায় বসার কথা ছিল, তা শুরু হওয়ার আগেই তিনি গিয়ংজু ত্যাগ করেন।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। এটি বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি তার দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসেরই প্রতিফলন। সম্মেলনকে এড়িয়ে গিয়ে, তিনি এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, ওয়াশিংটন এখন থেকে বড় আকারের আন্তর্জাতিক ফোরামের পরিবর্তে দ্বিপাক্ষিক, অর্থাৎ এক-এক-এক ভিত্তিতে, বাণিজ্য আলোচনায় বেশি আগ্রহী।

 

সম্মেলনের ঠিক আগে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে তার বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ঘোষণাকে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক চাল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি অ্যাপেকের বাকি ১৯টি সদস্য দেশকে পাশ কাটিয়ে, বিশ্বের এক নম্বর এবং চার নম্বর বৃহত্তম অর্থনীতির সাথে পৃথক বোঝাপড়ায় পৌঁছেছেন। এটি "গভীরতর বিভাজন"-এর প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অ্যাপেক নেতারা তাদের যৌথ ঘোষণায় সমাধান করার চেষ্টা করছিলেন।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুপস্থিতি আয়োজক দেশ দক্ষিণ কোরিয়া এবং এর প্রেসিডেন্ট লি জে মায়ুংকে একটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়া ঐতিহ্যগতভাবে তার প্রধান নিরাপত্তা মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বৃহত্তম অর্থনৈতিক অংশীদার চীনের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে।

 

গিয়ংজুতে একটি সফল বহুপাক্ষিক সম্মেলন আয়োজন করা ছিল সিউলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা এই দুই পরাশক্তির মাঝখানে তাদের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারতো। কিন্তু ট্রাম্পের এই আকস্মিক প্রস্থান, সিউলের সেই প্রচেষ্টাকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।

 

এইবারের অ্যাপেক ঘোষণাপত্রের মূল দুটি শব্দ ছিল "স্থিতিস্থাপকতা" (Resilience) এবং "অংশীদারিত্বমূলক সুবিধা" (Shared Benefits)। কূটনীতিকদের মতে, এই শব্দচয়ন বর্তমান বিশ্বের কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

 

"স্থিতিস্থাপকতা" শব্দটি দ্বারা মূলত সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনকে রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। গত কয়েক বছরে মার্কিন শুল্ক, চীনের বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং সেমিকন্ডাক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি নিয়ে দুই দেশের রেষারেষি প্রমাণ করেছে যে, বাণিজ্য এখন আর কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

 

অ্যাপেক নেতারা, বিশেষ করে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো, এমন একটি বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে যা কোনো একক দেশের (চীন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) খামখেয়ালিপনার ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। এই "স্থিতিস্থাপকতা" অর্জনের অর্থ হলো সরবরাহ শৃঙ্খলকে বহুমুখী করা এবং গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা করা।

 

অন্যদিকে, "অংশীদারিত্বমূলক সুবিধা" শব্দগুচ্ছটি ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের "আমেরিকা ফার্স্ট" বা সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতির সরাসরি জবাব। অ্যাপেক নেতারা পুনরায় মুক্ত বাণিজ্য এবং বৈশ্বিকীকরণের মূলনীতিতে তাদের আস্থা ব্যক্ত করেছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, বাণিজ্য কোনো 'শূন্য-সমষ্টির খেলা' (Zero-Sum Game) নয়, যেখানে একজনের জয়ে অন্যের পরাজয় নিশ্চিত। বরং, বাণিজ্যের সুবিধাগুলো যেন সদস্য দেশগুলোর সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাই অ্যাপেকের লক্ষ্য। এই ঘোষণাটি ছিল মূলত বিশ্বায়নের পক্ষে একটি দুর্বল কিন্তু সম্মিলিত কণ্ঠস্বর।

 

গিয়ংজু সম্মেলনটি অ্যাপেকের প্রতিষ্ঠার পর থেকে সম্ভবত সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো। একদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে চীনের সাথে প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক হ্রাস করার জন্য। ওয়াশিংটন যুক্তি দেখাচ্ছে যে, চীনের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি এবং আগ্রাসী পররাষ্ট্র নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার নিয়ম ভঙ্গ করছে।

 

অন্যদিকে, চীন নিজেকে মুক্ত বাণিজ্যের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। বেইজিং যুক্তি দিচ্ছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শুল্ক আরোপই বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মূল কারণ। চীন তার নিজস্ব বাণিজ্য বলয়, যেমন 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (বিআরআই) এবং 'আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব' (আরসিইপি)-এর মাধ্যমে এশিয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার প্রভাববলয় বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে।

 

এই দুই অর্থনৈতিক দানবের মাঝখানে চাপা পড়েছে অ্যাপেকের বাকি সদস্য দেশগুলো। তারা একই সাথে মার্কিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল এবং চীনের বিশাল বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এই দেশগুলো কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে চায় না। গিয়ংজু সম্মেলনে তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল এই দুই পরাশক্তিকে অন্তত আলোচনার টেবিলে রাখা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধ এড়ানো।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুপস্থিতি সেই প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, অ্যাপেকের মতো বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো, যা একসময় বিশ্বায়নের ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করতো, তা এখন ক্ষমতাধর দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক খেলার দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মায়ুং (কেন্দ্রে) শনিবার গিয়ংজু শহরে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন ফোরামের নেতাদের সাথে গ্রুপ ছবিতে পোজ দিয়েছেন। এই ছবিটি ঐক্যের প্রতীক হলেও, এর পেছনে ছিল গভীর বিভক্তির ছায়া।

 

সম্মেলন শেষে, নেতারা ঐতিহ্যবাহী গ্রুপ ছবিতে অংশ নিলেও, পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঐক্যবদ্ধ ছবির পেছনে যে গভীর ফাটল রয়েছে, তা একটি যৌথ ঘোষণাপত্র দিয়ে আড়াল করা সম্ভব নয়। গিয়ংজু শীর্ষ সম্মেলন হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু এশিয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক আধিপত্যের লড়াই কেবল শুরু হলো। নেতারা একটি "স্থিতিস্থাপক" ভবিষ্যতের কথা বললেও, সেই ভবিষ্যৎ অর্জনের পথ যে কতটা ভঙ্গুর, তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের খালি চেয়ারটিই সবচেয়ে বড় করে দেখিয়ে দিয়ে গেছে।

 

- Japan Times