রবিবার (২ নভেম্বর) গভীর রাতে জেলার কুলকাচেরলা মণ্ডলে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং একটি হাসিখুশি পরিবারের এমন করুণ পরিণতিতে প্রতিবেশীরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও প্রতিবেশীদের সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের পরিচয় এবং ঘটনার যে বিভীষিকাময় চিত্র উঠে এসেছে, তা যেকোনো সুস্থ বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অভিযুক্ত ব্যক্তি, ভেপুরি ইয়াদাইয়া (৪০), পেশায় একজন দিনমজুর ছিলেন। তিনি তার স্ত্রী আলিভেলু (৩৫), ছোট মেয়ে (প্রায় ১০ বছর বয়সী) এবং শ্যালিকা হনুমাম্মাকে (প্রায় ৪০-৪৫ বছর বয়সী) ঘুমের মধ্যেই কাস্তে বা ধারালো দা জাতীয় অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করেন।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা দম্পতির বড় মেয়েটিই এই ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়, সে পুলিশকে সেই ভয়াল রাতের যে বিবরণ দিয়েছে, তা শুনলে শিউরে উঠতে হয়।
তার বয়ান অনুযায়ী, শনিবার (১ নভেম্বর) তার বাবা ভেপুরি ইয়াদাইয়া এবং মা আলিভেলুর মধ্যে তীব্র ঝগড়া ও পারিবারিক অশান্তি হয়। এই ঝগড়ার এক পর্যায়ে তার মা বাড়ি ছেড়ে চলেও গিয়েছিলেন, যদিও পরে আবার ফিরে আসেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে, আলিভেলু তাদের ঝগড়া মেটানোর জন্য এবং মধ্যস্থতা করার আশায় পার্শ্ববর্তী মণ্ডল থেকে নিজের বোন হনুমাম্মাকে তাদের বাড়িতে ডেকে পাঠান। পরিবারের মঙ্গল কামনায় সেই ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন হনুমাম্মাও, তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে এই মধ্যস্থতা করতে আসাই তার জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হতে চলেছে।
শনিবার রাতে পরিবারের সবাই যখন ঘুমাতে যায়, তখনো হয়তো চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। রবিবার ভোর আনুমানিক ২:৩০ থেকে ৩:০০ টার মধ্যে, যখন গোটা এলাকা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই ইয়াদাইয়া তার নারকীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে।
বেঁচে ফেরা মেয়েটি জানায়, সে ঘুমন্ত অবস্থাতেই চিৎকার ও গোঙানির শব্দে জেগে ওঠে। সে দেখতে পায়, তার বাবা প্রথমে তার মাসি হনুমাম্মাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করছে। মাসিকে বাঁচাতে মা আলিভেলু ছুটে এলে, ইয়াদাইয়া তার স্ত্রীর ওপরও চড়াও হয়। মা ও মাসিকে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর, ইয়াদাইয়ার পৈশাচিক দৃষ্টি পড়ে তার দুই শিশুকন্যার ওপর।
মেয়েটি জানায়, বাবা তাদের দিকে এগিয়ে এসে এক শীতল উক্তি করেন: "ওরা (মা ও মাসি) তো মরেই গেল, তোরা বেঁচে থেকে কী করবি? তোদের কেই বা দেখবে?" এই কথা বলেই সে তার দুই মেয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই হামলায় ছোট মেয়েটি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়। তবে, বড় মেয়েটি কোনোক্রমে বাবার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়। মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাত পাওয়া সত্ত্বেও, সে রক্তাক্ত অবস্থাতেই বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে প্রতিবেশীদের দরজায় আঘাত করতে থাকে এবং সাহায্যের জন্য চিৎকার শুরু করে।
মেয়েটির আর্তচিৎকারে প্রতিবেশীরা জেগে ওঠেন এবং দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারাই প্রথম ঘরের ভেতরের সেই বীভৎস দৃশ্য দেখতে পান। ঘরের মেঝেতে আলিভেলু, হনুমাম্মু এবং ছোট মেয়েটির রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে ছিল। প্রতিবেশীরাই তৎক্ষণাৎ 'ডায়াল ১০০' জরুরি অবস্থানম্বরে ফোন করে পুলিশে খবর দেন।
খবর পেয়েই পারিগির ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ (ডিএসপি) শ্রীনিবাসের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশাল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ এসে তিনটি মৃতদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি বাড়িটির অন্য একটি ঘর থেকে ভেপুরি ইয়াদাইয়ার ঝুলন্ত মরদেহও উদ্ধার করে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, তিনজনকে হত্যা করার পর ইয়াদাইয়া নিজেই ঘরের ছাদে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ দীর্ঘদিনের তীব্র পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ। শনিবারের ঝগড়াই এই চূড়ান্ত বিপর্যয়ের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে। যে শ্যালিকা দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে নিজের বাড়ি ছেড়ে ছুটে এসেছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত তিনিই এই আক্রোশের প্রথম শিকার হন।
ডিএসপি শ্রীনিবাস সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, "আমরা ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি (একটি কাস্তে) উদ্ধার করেছি। চারটি মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।" তিনি আরও জানান, "আহত মেয়েটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং তার অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গেছে। আমরা তার জবানবন্দি রেকর্ড করেছি, যা এই মামলার তদন্তে প্রধান সাক্ষ্য হিসেবে কাজ করবে।"
কুলকাচেরলা মণ্ডলের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি নিছক একটি অপরাধের খবর নয়, এটি ভারতীয় সমাজের গভীরে বাড়তে থাকা এক মানসিক সংকটেরও প্রতিচ্ছবি। মনোবিদ এবং সমাজতত্ত্ববিদরা প্রায়শই পারিবারিক কলহের এমন হিংস্র রূপান্তরের পেছনে দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি চরম অবহেলাকে দায়ী করেন।
প্রায়শই দেখা যায়, ব্যক্তিরা তাদের রাগ, হতাশা বা মানসিক যন্ত্রণা নিয়ন্ত্রণের সঠিক উপায় খুঁজে পান না। যখন কোনো ব্যক্তি মনে করেন যে তিনি তার জীবনের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন, তখন তিনি এমন এক ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেন, যেখানে তিনি কেবল নিজের প্রতিপক্ষকেই নয়, বরং নিজের জীবনের সকল চিহ্ন (এক্ষেত্রে তার সন্তান) মুছে ফেলে নিজেকেও শেষ করে দেন।
ভেপুরি ইয়াদাইয়ার ঘটনাটিও হয়তো এমনই এক মানসিক ভাঙনের ফসল। তার শেষ কথাগুলো ("তোরা বেঁচে থেকে কী করবি?") প্রমাণ করে যে, সেই মুহূর্তে তিনি এক গভীর শূন্যতা ও বিকৃত মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, যেখানে তিনি তার সন্তানদের ভবিষ্যৎকে নিজের জীবনের সাথেই বেঁধে ফেলেছিলেন।
এই ঘটনায় একটি পরিবার চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেল। প্রাণ গেল চারটি নিরীহ জীবনের। আর যে শিশুটি এই ভয়াবহতা থেকে বেঁচে ফিরল, তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে সেই এক রাতের দুঃসহ স্মৃতি, যা তার চোখের সামনেই তার বাবাকে হত্যাকারী এবং তার মা-বোনকে অসহায় শিকার হতে দেখিয়েছে। পুলিশ এই ঘটনায় হত্যা ও আত্মহত্যার একটি মামলা দায়ের করে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু যে সামাজিক ব্যাধির কারণে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে, তার সমাধান খুঁজে বের করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।