সোমবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫
১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হেফাজতে মৃত্যু রোধ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় ও কঠোর নির্দেশনা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ০৬:২৯ পিএম

হেফাজতে মৃত্যু রোধ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় ও কঠোর নির্দেশনা
ছবি: Dawn News

নাগরিকদের ‘জীবনের অধিকার’ রক্ষা করা এবং পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব বলে রায় দিয়েছে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। শনিবার প্রকাশিত এক রায়ে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে, কোনো অবস্থাতেই বিনা বিচারে আটক, হেফাজতে নির্যাতন বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়।

 

পাঞ্জাবের ডেরা গাজি খানে পুলিশি হেফাজতে এক নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা একটি আপিল খারিজ করে আদালত এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২০ সালে জারিয়াব খান নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়, যিনি পরবর্তীতে পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীন মৃত্যুবরণ করেন। ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি বা এফআইএ-র দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাকে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।

 

যদিও একটি নিম্ন আদালত বা ফৌজদারি আদালত তাদের খালাস দিয়েছিল, কিন্তু গুরুতর পেশাগত অসদাচরণের দায়ে বিভাগীয় তদন্ত শেষে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। আদালতের খালাসের দোহাই দিয়ে ওই কর্মকর্তারা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে বিচারক জামাল খান মান্দোখেল সাত পৃষ্ঠার এক বিস্তারিত রায়ে তা খারিজ করে দেন এবং বরখাস্তের আদেশ বহাল রাখেন।

 

রায়ে বিচারপতি জামাল খান মান্দোখেল উল্লেখ করেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, “জীবনের অধিকার হলো সর্বোচ্চ মানবাধিকার। অবৈধ আটক, গ্রেফতার, বর্বরতা, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংবিধানের মৌলিক নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাই কোনো পরিস্থিতিতেই অবৈধ আটক বা নির্যাতনকে সমর্থন বা যৌক্তিকতা দেওয়া যায় না।”

 

আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায় যে, নির্যাতনের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে পুলিশ অনেক সময় অলিখিত দায়মুক্তি বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে ধরে নেয়, যা মানবাধিকার ও আইনের শাসনের সরাসরি লঙ্ঘন। সংবিধানের ৪, ১০ এবং ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার (UDHR) উদ্ধৃতি দিয়ে আদালত মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের মর্যাদা অলঙ্ঘনীয় এবং আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া (Due Process) ছাড়া কারো স্বাধীনতা বা জীবন হরণ করা যাবে না।

 

রায়ে পুলিশ বাহিনীর ওপর একটি কার্যকর, নিবেদিত এবং নিরপেক্ষ বাহ্যিক নজরদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিচারক বলেন, পুলিশ আইনের রক্ষক। আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো সরকারি কর্মচারী যদি কোনো নাগরিকের ক্ষতি করেন বা নির্যাতন করেন, তবে তা কেবল মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘনই নয়, বরং ফৌজদারি অপরাধ এবং গুরুতর অসদাচরণও বটে।

 

পাকিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানবাধিকার কমিশনের (এইচআরসিপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে কেবল পাঞ্জাবেই পাঁচ শতাধিক কথিত বন্দুকযুদ্ধের (এনকাউন্টার) ঘটনা ঘটেছে এবং এতে ৬৭০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

 

এর আগে গত অক্টোবরে সাবেক বিচারপতি আতহার মিনাল্লাহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও পুলিশি নির্যাতনকে গণতান্ত্রিক সমাজে ‘অসহনীয় অপরাধ’ এবং সংবিধানের ‘জঘন্যতম লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি আইনি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

- DAWN