মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকেলে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে একটি সুষ্ঠু ও ন্যায়ভিত্তিক বিচারপ্রক্রিয়ার আইনি ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে এই নথি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হয়।
আদালত সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অত্যন্ত সংবেদনশীল এই মামলার ডেথ রেফারেন্সের নথিতে স্বাক্ষর করেন।
তাঁর স্বাক্ষরের পরপরই বিচারিক আদালতের পক্ষ থেকে তা হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো হয়। পাঠানো এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথির মধ্যে রয়েছে ৬৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি এবং ৩ পৃষ্ঠার ডেথ রেফারেন্সসহ সর্বমোট ৭২ পৃষ্ঠার বিস্তারিত বিবরণ।
বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনি বিধিবিধান অনুযায়ী, নিম্ন বা বিচারিক আদালতের দেওয়া যেকোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় চূড়ান্তভাবে কার্যকরের পূর্বে হাইকোর্টের অনুমোদন গ্রহণের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এর মাত্র দুদিন আগে, গত ৭ জুন দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী অত্যন্ত মর্মান্তিক এই মামলার রায় ঘোষণা করেন একই ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন। কাঠগড়ায় আসামিদের উপস্থিতিতে ঘোষিত ওই রায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে সর্বোচ্চ শাস্তি তথা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেওয়া হয়।
সর্বোচ্চ এই সাজার পাশাপাশি, আদালত প্রধান আসামি সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। রায়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিচারক উল্লেখ করেন যে, জরিমানার এই সম্পূর্ণ অর্থ ভুক্তভোগী নিহত শিশু রামিসার বৈধ আইনগত উত্তরাধিকারীরা পাবেন।
আসামিরা ক্ষতিপূরণের এই নির্ধারিত অর্থ স্বেচ্ছায় প্রদানে ব্যর্থ হলে তাদের নিজ নামে থাকা সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি আইনি প্রক্রিয়ায় নিলামে বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
আদালত তার রায়ের পর্যবেক্ষণে এই জঘন্য অপরাধের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। চিকিৎসা প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারক সন্দেহাতীতভাবে নিশ্চিত হয়েছেন যে, নির্মমভাবে হত্যার শিকার হওয়ার আগে শিশুটিকে পাশবিক নির্যাতনের মাধ্যমে ধর্ষণ করা হয়েছিল এবং তার শরীরে বিভিন্ন স্থানে জখম ও আঘাতের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এছাড়া, প্রধান আসামি সোহেল রানা বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছিলেন, পরবর্তীতে তা প্রত্যাহারের জন্য আইনিভাবে কোনো আবেদন তিনি করেননি।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এই বিষয়টি প্রমাণ করে যে সোহেল রানা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে নিজের দোষ স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, অপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না খাতুন এই অমানবিক ও জঘন্য অপরাধ প্রতিরোধে কোনো মানবিক বা আইনি পদক্ষেপ তো নেনইনি, বরং অপরাধ সংঘটনের সময় নীরব থেকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন এবং হত্যার পর নিজ স্বামীকে আত্মগোপন বা পালিয়ে যেতে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করেছেন।
সার্বিক অপরাধের মাত্রা, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা গভীরভাবে পর্যালোচনার ভিত্তিতেই আদালত এই সর্বোচ্চ সাজার রায় প্রদান করেছেন, যা এখন হাইকোর্টের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।