বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণপরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বৈঠক

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম

গণপরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বৈঠক
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা মহানগরের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত যানজট, গণপরিবহনের চরম অব্যবস্থাপনা এবং সড়কে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর করে একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও নাগরিকবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এক উচ্চপর্যায়ের বিশেষ পর্যালোচনা বৈঠকে বসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

আজ বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী বৈঠকটি শুরু হয়। দেশের রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থাকে একটি সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নেওয়া এই উদ্যোগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

 

তাঁরা মনে করেন, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সমস্যা সমাধানে শীর্ষ রাজনৈতিক সদিচ্ছার যে ঘাটতি ছিল, আজকের এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও দ্রুত সম্প্রসারণশীল মেগাসিটি ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই ভয়াবহ যানজট এবং অপরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে আক্ষরিক অর্থেই ধুঁকছে। প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত লাখ লাখ কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নেমে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হয়।

 

গণপরিবহনগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী তোলার জন্য চালক ও সহকারীদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, ট্রাফিক আইন চরমভাবে অমান্য করার প্রবণতা এবং যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে সড়কে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা নিত্যদিনের সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে।

 

এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি শুধু নাগরিকদের মূল্যবান কর্মঘণ্টাই নষ্ট করছে না, বরং প্রতিনিয়ত অসংখ্য ছোট-বড় মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এমন একটি দমবন্ধ করা ও অমানবিক পরিস্থিতি থেকে অবরুদ্ধ নগরবাসীকে স্থায়ী মুক্তি দিতে এবং পরিবহন খাতে দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।

 

সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত এই সমন্বিত ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পরিবহন ও নগর ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের শীর্ষ ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেছেন।

 

পরিবহন খাতের সার্বিক চিত্র তুলে ধরতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নগর প্রশাসনের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়নের খুঁটিনাটি নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বৈঠকে উপস্থিত থেকে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনা, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরছেন।

 

প্রশাসনিক সমন্বয় ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থে উপস্থিত রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক।

 

একইসাথে, মাঠ পর্যায়ে পরিবহন ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের সাথে সরাসরি যুক্ত ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদও এই বৈঠকে অংশ নিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র ও আইনি প্রয়োগের প্রতিবন্ধকতাগুলো প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করছেন।

 

নির্ভরযোগ্য প্রশাসনিক সূত্র থেকে জানা গেছে, বৃহস্পতিবারের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভার মূল আলোচ্য সূচিতে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে ঢাকার গণপরিবহনগুলোর রুটভিত্তিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ এবং বাস মালিকদের একচেটিয়া দৌরাত্ম্য কমিয়ে যাত্রীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি।

 

বর্তমানে একই রুটে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির বাস চলাচল করার কারণে সড়কে যে অসুস্থ ও মরণঘাতী প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়, তা নিরসন করতে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি বা একটি নির্দিষ্ট রুটে একটি মাত্র কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার প্রস্তাবনাটি এই বৈঠকে নতুন করে ও জোরালোভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

এছাড়া বছরের পর বছর ধরে চলা ফিটনেসবিহীন, লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি রাজপথ থেকে চিরতরে সরিয়ে নেওয়া, পরিবেশবান্ধব যানের অনুমোদন বৃদ্ধি এবং বাস চালক ও সহকারীদের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার জন্য কঠোর আইনি কাঠামো প্রয়োগের বিষয়টিও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

 

গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি সড়কে সাধারণ যাত্রী, শিশু, নারী, বয়স্ক নাগরিক ও পথচারীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর এই বৈঠকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে একটি জাতীয় আতঙ্কে পরিণত হয়েছে এবং এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম প্রধান হুমকি।

 

বিশেষ করে ঢাকা শহরের ভেতরে বেপরোয়া বাস চলাচলের কারণে প্রায়ই জেব্রা ক্রসিং বা ফুটপাতে নিরীহ পথচারী ও ছোট যানবাহনের যাত্রীরা নির্মমভাবে প্রাণ হারাচ্ছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধ করতে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়, দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে বেশ কিছু যুগান্তকারী প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

সিগন্যাল অমান্যকারী এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরও কার্যকর, দ্রুতগামী ও দৃশ্যমান করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একটি আধুনিক মেগাসিটির পরিবহন ব্যবস্থাপনা কোনো একক সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

 

এর জন্য প্রয়োজন সিটি কর্পোরেশন, ডিটিসিএ, বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ এবং সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি নিশ্ছিদ্র, কার্যকর ও সার্বক্ষণিক সমন্বয়। অতীতে বারবার দেখা গেছে, সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তঃযোগাযোগের চরম অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং একে অপরের ওপর দায় চাপানোর নেতিবাচক প্রবণতার কারণে অনেক ভালো উদ্যোগই আলোর মুখ দেখেনি।

 

আজকের এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত থাকায় এবং কঠোর দিকনির্দেশনা প্রদান করায় সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার এই দীর্ঘদিনের পাথুরে দেয়াল ভেঙে একটি কার্যকর, টেকসই ও ঐক্যবদ্ধ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হবে বলে নগর বিশেষজ্ঞরা দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করছেন।

 

ঢাকা শহরের সাধারণ নাগরিকদের কাছে আজকের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি একটি নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বছরের পর বছর ধরে পরিবহন নৈরাজ্যের শিকার সাধারণ মানুষ এখন আর শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ প্রতিশ্রুতি নয়, বরং রাস্তায় দৃশ্যমান ও কার্যকর সমাধান দেখতে চায়।

 

গণপরিবহনকে কীভাবে নারীবান্ধব, শিশুদের জন্য নিরাপদ এবং প্রতিবন্ধী বা বয়স্ক যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক ও প্রবেশযোগ্য করা যায়, সেই বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট ও কঠোর দিকনির্দেশনা আসবে বলে নাগরিক সমাজ গভীরভাবে প্রত্যাশা করছে।

 

এছাড়া সনাতন পদ্ধতির টিকিট ব্যবস্থার বিলোপ ঘটিয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা কার্ডভিত্তিক ই-টিকেটিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করা এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে নির্দিষ্ট বাস স্টপেজের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার মতো বিষয়গুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে নগরীর চেহারায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

 

ঢাকার যানজট নিরসন শুধু নাগরিকদের মানসিক স্বস্তিই দেবে না, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিপুল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের পূর্ববর্তী বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার যানজটের কারণে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা রাস্তায় নষ্ট হয় এবং অতিরিক্ত জ্বালানি অকারণে পুড়ে যায়, তার বার্ষিক আর্থিক মূল্য হাজার হাজার কোটি টাকার সমান, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ খেয়ে ফেলছে।

 

এছাড়া রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা যানজটের গাড়িগুলো থেকে নির্গত মাত্রাতিরিক্ত কালো ধোঁয়া শহরের বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে, যা নাগরিকদের ফুসফুসের ক্যানসার, শ্বাসকষ্টসহ নানাবিধ জটিল রোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তাই গণপরিবহন ব্যবস্থার এই আমূল সংস্কার কেবল যাতায়াতগত স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই নয়, বরং জনস্বাস্থ্য রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধির জন্যও অপরিহার্য একটি পদক্ষেপ।

 

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চলমান এই বৈঠকটি দেশের রাজধানী শহরের ভবিষ্যৎ পরিবহন ব্যবস্থার স্থায়ী রূপরেখা নির্ধারণে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে কাজ করতে পারে।

 

রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা কঠোর বার্তা এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা যদি মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সততা, জবাবদিহিতা ও চরম আন্তরিকতার সাথে বাস্তবায়িত হয়, তবে অচিরেই ঢাকা একটি যানজটমুক্ত, নিরাপদ, আধুনিক ও বসবাসযোগ্য মেগাসিটিতে পরিণত হতে পারে।

 

বৈঠক শেষে এই বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত অবহিত করা হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব সিদ্ধান্তের দৃশ্যমান বাস্তবায়ন শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।