বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুরআন শিক্ষার প্রসার ও বিজয়ীদের সম্মাননায় কাজ করবে সরকার: রাষ্ট্রপতি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম

কুরআন শিক্ষার প্রসার ও বিজয়ীদের সম্মাননায় কাজ করবে সরকার: রাষ্ট্রপতি
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও হিফজ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের জন্য অসামান্য গৌরব বয়ে আনা হাফেজ এবং ধর্মীয় শিক্ষার শিক্ষার্থীদের যথাযথ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের পাশাপাশি দেশে কুরআন চর্চা ও ধর্মীয় শিক্ষাকে আরও বেশি উৎসাহিত করতে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর রাজধানী ঢাকার বঙ্গভবনে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে ৪৬তম কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক পবিত্র কুরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী বাংলাদেশি প্রতিযোগীদের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তিনি এই সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।

 

রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্য দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং কুরআন চর্চার প্রতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক বার্তা হিসেবেই সর্বত্র বিবেচিত হচ্ছে।

 

সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় অনুষ্ঠিত অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ৪৬তম কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক পবিত্র কুরআন প্রতিযোগিতা বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর কাছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ, প্রাচীন ও সম্মানজনক একটি ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।

 

প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাছাই করা শ্রেষ্ঠ হাফেজ ও কারিরা এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। এবার বিশ্বের ১৩৩টি দেশের শ্রেষ্ঠ হাফেজ ও কারিদের সঙ্গে তীব্র ও মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে বাংলাদেশের তরুণ ও শিশু-কিশোর প্রতিযোগীদের এই অসামান্য সাফল্য অর্জন সমগ্র জাতির জন্য অত্যন্ত গর্ব, আনন্দ এবং সম্মানের একটি অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।

 

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে বিজয়ী প্রতিযোগী, তাদের নেপথ্যের কারিগর হিসেবে কাজ করা সুযোগ্য শিক্ষক বা উস্তাদ, সর্বদা সমর্থন জুগিয়ে যাওয়া পরিবার ও অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সবাইকে এই বিরল ও ঐতিহাসিক অর্জনের জন্য অত্যন্ত আন্তরিকভাবে অভিনন্দন ও সাধুবাদ জানান।

 

তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বিশ্বদরবারে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল, মহিমান্বিত এবং সুদৃঢ় করেছে।

 

দেশের ধর্মচর্চা, ইসলামী মূল্যবোধের সুস্থ বিকাশ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামাজিকভাবে সক্রিয় ও সমৃদ্ধ করে তোলার ক্ষেত্রে অতীতের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগগুলোর কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

তিনি তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের ধর্মীয় অবকাঠামো উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নেওয়া বিভিন্ন যুগান্তকারী, দূরদর্শী ও গঠনমূলক পদক্ষেপের কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে উল্লেখ করেন।

 

তিনি বলেন, দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং সমাজে আলেম-ওলামা, ইসলামী চিন্তাবিদ ও পবিত্র কুরআনের হাফেজদের যথাযথ সামাজিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারও সম্পূর্ণরূপে অঙ্গীকারবদ্ধ।

 

রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এই ধরনের পৃষ্ঠপোষণামূলক নীতি গ্রহণ করা হলে সমাজে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশ ঘটবে এবং যুবসমাজ বিপথগামিতা থেকে রক্ষা পাবে বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

বঙ্গভবনের মতো রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থানে বিজয়ী প্রতিযোগী এবং তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকদের আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আগত প্রতিনিধি দলের সদস্যরা রাষ্ট্রপতির প্রতি তাঁদের গভীর কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

 

প্রতিনিধি দলের সদস্যরা রাষ্ট্রপতির কাছে দেশের ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে তাদের কিছু যৌক্তিক প্রত্যাশা ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তাঁরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, রাজধানী থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন মাদ্রাসা, মক্তবসহ অন্যান্য ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মেধাবী শিক্ষার্থী, পবিত্র কুরআনের হাফেজ এবং আলেম সমাজকে যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা হয়, তবে দেশের সাধারণ মানুষ কুরআন চর্চা এবং ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের প্রতি আরও বহুগুণ বেশি উৎসাহিত হবে।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মেধার স্বাক্ষর রেখে দেশের জন্য যারা এমন অভাবনীয় ও গৌরবজনক সাফল্য বয়ে আনছেন, তাঁদের মেধা ও নিরলস অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ সম্মাননা, বৃত্তি প্রদান এবং উপযুক্ত মর্যাদা প্রদানের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তাঁরা সরকারের প্রতি বিনীতভাবে অনুরোধ জানান।

 

বঙ্গভবনের এই বিশেষ সম্মাননা অনুষ্ঠানে কুরআন শিক্ষা মিশন, বাংলাদেশের মাননীয় চেয়ারম্যান মাওলানা মো. বিল্লাল হোসেনের সুযোগ্য নেতৃত্বে বিজয়ী প্রতিযোগীদের একটি প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিল, যাদের অনন্য কৃতিত্ব গোটা দেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে পরিচিত করেছে।

 

তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আর রায়হান ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার মেধাবী শিক্ষার্থী হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া, যিনি ১৫ পারা হিফজ, তাজবীদ ও সুন্দর তিলাওয়াত বিভাগে বিশ্বের শত শত প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করার এক অভাবনীয় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।

 

একই বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন তানযীমুল উম্মাহ গার্লস হিফয মাদ্রাসার প্রতিভাময়ী শিক্ষার্থী হাফেজা রাবেতা বিনতে রমজান, যা নারী শিক্ষায় এক অনন্য মাইলফলক।

 

এছাড়া ৩০ পারা হিফজ, তাজবীদ ও সুন্দর তিলাওয়াত বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন মারকাযুল মদীনা মাদ্রাসার অদম্য মেধাবী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হাফেজ শেখ মো. মাহমুদুল হাসান (আশরাফী)।

 

তাঁর এই সাফল্য শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থিত সবার জন্য ছিল দারুণ অনুপ্রেরণাদায়ক; এটি প্রমাণ করে যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো শারীরিক বাধাই সফলতার পথে অন্তরায় হতে পারে না।

 

পাশাপাশি সাউদা বিনতে জামআ’হ (রা.) আন্তর্জাতিক বালিকা মাদ্রাসার কৃতী শিক্ষার্থী হাফেজা মুসফিরা বিনতে মাহমুদও এই প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে উপস্থিত থেকে দেশের মেয়েদের ধর্মীয় শিক্ষায় অগ্রগতির এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন।

 

উপস্থিত সকলের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অত্যন্ত আবেগঘন, গভীর ও গঠনমূলক ভাষায় বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই ধর্মানুরাগী, ধর্মপ্রাণ মুসলিম এবং তাঁদের প্রাত্যহিক ও সামাজিক জীবনে ধর্মীয় রীতিনীতির ইতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত সুগভীর।

 

এ দেশের সাধারণ মানুষ অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটকালীন মুহূর্তে নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, স্বকীয়তা, বিশ্বাস এবং হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় অনেক বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছে।

 

সময়ের পরিক্রমায় এবং সাম্প্রতিক কালের নানা ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আজ নতুন এক সম্ভাবনাময় ও ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় প্রবেশ করেছে বলে রাষ্ট্রপতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন।

 

তিনি বলেন, এই নতুন যাত্রাপথে একটি আধুনিক, দুর্নীতিমুক্ত, সহনশীল ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন উন্নত সমাজ গঠনে ধর্মীয় শিক্ষার যথাযথ প্রসার ও মানোন্নয়ন অপরিহার্য। তাই বর্তমান সরকার এই সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাবে বলে তিনি সমগ্র জাতিকে আশ্বস্ত করেন।

 

অত্যন্ত আন্তরিক, উষ্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই দীর্ঘ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট বিজয়ী প্রতিযোগীদের গর্বিত অভিভাবক, পরম শ্রদ্ধেয় উস্তাদ বা শিক্ষকগণ এবং কুরআন শিক্ষা মিশন, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় পরিচালকবৃন্দ উপস্থিত থেকে এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনকে আরও বেশি প্রাণবন্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলেন।

 

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক দরবারে দেশের মুখ উজ্জ্বল করা এই কৃতি ও বিজয়ী হাফেজদের মেধার সর্বোচ্চ স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রপতি স্বয়ং তাঁর নিজ হাতে তাঁদের প্রত্যেককে রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্রেস্ট প্রদান করেন।

 

একই সঙ্গে দেশের এই অমূল্য রত্নদের গড়ে তোলার পেছনে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম রয়েছে, সেই বিজয়ীদের পরিবারের সম্মানিত সদস্য এবং শিক্ষক-উস্তাদদের প্রতি গভীর সম্মান জানিয়ে তাঁদের হাতেও রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে বিশেষ সৌজন্য উপহার তুলে দেওয়া হয়, যা উপস্থিত সবার জন্য ছিল এক পরম প্রাপ্তি ও অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।

 

এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎকালে বঙ্গভবনের সাথে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রপতির সচিববৃন্দ এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি বর্তমান সরকারের অকুন্ঠ সম্মান প্রদর্শন ও পৃষ্ঠপোষকতার একটি সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল প্রতিফলন হিসেবেই সর্বমহলে পরিগণিত হয়েছে।