মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহী নগরীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকার বদ্ধপরিকর জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষের অধিকার রক্ষায় যতদূর যাওয়া প্রয়োজন, সরকার ততদূরই যাবে।
একই সঙ্গে কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বর্তমান সরকারের বহুমুখী পরিকল্পনার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজশাহীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা পদ্মা নদীর বর্তমান করুণ দশার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একসময়ের খরস্রোতা পদ্মা নদী কীভাবে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে এবং নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করছে।
এই পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশকে রক্ষার জন্য সরকার একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দুটি নদী-উত্তরের তিস্তা এবং রাজশাহীর পদ্মায় আধুনিক ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র হাহাকার দূর হবে এবং কৃষিকাজে সেচ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হবে।
পানি সংকটের জন্য দায়ী পক্ষের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনার ইঙ্গিত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে, সরকার তাদের সঙ্গে অত্যন্ত জোরালোভাবে কথা বলবে। বাংলাদেশের মানুষের পানির ন্যায্য অধিকার ও হিস্যা আদায়ে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হবে এবং দেশের মানুষের অধিকার ছিনিয়ে আনা হবে।
পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজের কাজ এই সরকারের আমলেই শুরু এবং সফলভাবে সমাপ্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি খাতের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপগুলোর কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, দেশের কৃষক বাঁচলে তবেই বাংলাদেশের কৃষি বাঁচবে-এটিই বর্তমান সরকারের মূল রাজনৈতিক দর্শন।
এই দর্শনের আলোকেই সরকার দেশজুড়ে প্রায় চার হাজার আখচাষিকে বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের ব্যবস্থা করেছে, যাতে আগামী মৌসুমে তাদের উৎপাদন খরচ ও আর্থিক কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়।
নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের মাত্র সাত দিনের মাথায় কৃষকদের কল্যাণে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
সারা দেশের প্রায় ১৩ লাখ কৃষকের দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বকেয়া কৃষি ঋণ সুদসহ সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকার যা প্রতিশ্রুতি দেয়, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে।
কৃষকদের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার আওতায় আনতে 'কৃষক কার্ড' চালুর এক অভিনব ও যুগান্তকারী উদ্যোগের কথা জনসভায় ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, এরই মধ্যে সারা দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি, প্রান্তিক, ভূমিহীন এবং বড় কৃষকদের একটি নির্ভুল তথ্যভাণ্ডার প্রণয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই তালিকা তৈরির কাজ শেষ হবে এবং পর্যায়ক্রমে প্রকৃত কৃষকদের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। চলতি বছর দেশজুড়ে প্রায় ৪০ লাখ ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নারী-পুরুষ কৃষকের হাতে এই কৃষক কার্ড তুলে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
এই কার্ডের বহুমুখী সুবিধার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো কৃষক যদি বছরে দুটি বা তিনটি ফসল উৎপাদন করেন, তবে সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত একটি ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সার, উন্নত মানের বীজ এবং কীটনাশক এই কার্ডের মাধ্যমে যথাসম্ভব সরবরাহ করা হবে।
এর পাশাপাশি কৃষক কার্ড ব্যবহার করে কৃষকরা অত্যন্ত সহজে তাদের উৎপাদিত ফসলের বিমা করতে পারবেন এবং সহজ শর্তে ও দ্রুততম সময়ে ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় কৃষি ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক রাখার জন্য দেশব্যাপী খাল খনন ও নদী সংস্কারের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও সংস্কার করার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো, গত আট মাসের মধ্যেই প্রায় ৮০০ কিলোমিটার খাল খননের কাজ ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই খালগুলো খননের ফলে একদিকে যেমন কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পর্যাপ্ত পৃষ্ঠজলের সুবিধা পাবেন, অন্যদিকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও পুনরায় বৃদ্ধি পাবে, যা এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বিরাট ভূমিকা রাখবে।
জনস্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নয়ন এবং চিকিৎসাসেবার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষকে যেন সামান্য অসুখেই দূরবর্তী সদর হাসপাতাল বা শহরের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে ছুটতে না হয়, সে জন্য উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
তিনি ঘোষণা করেন যে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান শয্যাসংখ্যা এক হাজার ৩০০ থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার ৫০০-তে উন্নীত করা হবে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াই তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে এসে প্রধানমন্ত্রী দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও বিশ্লেষণধর্মী বার্তা প্রদান করেন।
একটি স্বাভাবিক ব্যবসাকেন্দ্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একটি দোকানের সামনে যদি প্রতিনিয়ত বিশৃঙ্খলা, হইচই বা অরাজকতা লেগে থাকে, তবে সেই দোকানে কখনোই স্বাভাবিক বেচাকেনা হতে পারে না।
ঠিক একইভাবে, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার যখন দেশে নিরাপত্তা বৃদ্ধি, বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করা, কৃষকদের স্বাবলম্বী করা এবং দেশে-বিদেশে শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহল ও তাদের মিত্ররা রাজপথে কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।
দেশি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে দেশের বেকার যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির যে মহান উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেছে, সেই মহৎ কাজকে বাধাগ্রস্ত করা এবং সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এই অপশক্তিগুলো উঠেপড়ে লেগেছে বলে প্রধানমন্ত্রী তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি দেশবাসীকে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচক রাজনীতির বিরুদ্ধে সজাগ থাকার এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারের পাশে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানান।