বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর দুপুর পৌনে একটার দিকে পর্যটকদের বহনকারী দীর্ঘ এই গাড়িবহরটি সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ অবস্থায় খাগড়াছড়ি শহরে প্রবেশ করে। এর মধ্য দিয়ে গত কয়েকদিন ধরে চলা গভীর উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার একটি সাময়িক সমাপ্তি ঘটল।
পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে যারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, নিজ গন্তব্যে ফেরার পথে তাদের চোখেমুখে ছিল স্বস্তির ছাপ। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে নয়টার দিকে পর্যটকরা সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে তাদের ফিরতি যাত্রা শুরু করেন।
তবে এই ফেরার পথটি একেবারেই মসৃণ ছিল না। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ও দুর্গম সড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধকারীদের তৈরি করা বাধা ও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় তাদের। কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকস সদস্যদের প্রত্যক্ষ সহায়তা, অসীম ধৈর্য এবং পেশাদারিত্বের কারণে পর্যটকরা সকল প্রকার বিপত্তি পেরিয়ে নিরাপদে নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
ভুক্তভোগী পর্যটকরা তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, সাজেক এলাকায় হঠাৎ করে শুরু হওয়া আন্দোলন এবং সড়ক অবরোধের কারণে তারা চরম মানসিক চাপের মধ্যে সময় পার করছিলেন। আনন্দময় একটি ছুটির সময় কাটানোর বদলে চারপাশের থমথমে পরিস্থিতি তাদের ভেতরে তীব্র আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিল।
ফেরার পথে পরিস্থিতি আরও কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাহাড়ি সড়কের কয়েকটি স্থানে অবরোধকারীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সরাসরি ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার মতো অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটে।
তবে সেনাবাহিনীর অত্যন্ত সুপরিকল্পিত পদক্ষেপের কারণে এই সংঘাতময় পরিস্থিতির কোনো আঁচ পর্যটকদের গায়ে লাগতে পারেনি এবং তাদের কোনো ধরনের শারীরিক বা বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি।
রাজধানী ঢাকা থেকে সাজেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটক আবুল কাশেম তার হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, তারা মূলত দুই রাত ও তিন দিনের একটি আনন্দ ভ্রমণের পরিকল্পনা নিয়ে বুধবার সাজেকে গিয়েছিলেন।
কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর সন্ধ্যার দিকে তারা জানতে পারেন যে, এলাকায় এক তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় বৃহস্পতিবার বাধ্য হয়ে তাদের সাজেক ত্যাগ করতে হয়। তিনি আক্ষেপ করে জানান, তিন দিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে তারা ইতিমধ্যে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করে দিয়েছেন।
এখন এই অপরিশোধিত গাড়ি ভাড়ার আর্থিক ক্ষতি কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়ে তারা গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। শুধু তাই নয়, ঢাকায় ফেরার জন্য তাদের বাসের আসন সংরক্ষণ করা ছিল আরও দুই দিন পরের। ফলে বাস কর্তৃপক্ষের সাথে নতুন করে আলোচনা করে যাত্রার সময়সূচি পরিবর্তন করার মতো আরেকটি জটিলতার মুখে পড়েছেন তারা।
অয়ন নামের আরেকজন পর্যটক তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জানান, সাজেক থেকে সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তা পাহারার মাধ্যমেই মূলত পর্যটকবাহী গাড়িগুলোকে খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, ফেরার পথে অন্তত দুটি স্থানে তাদের গাড়িবহরকে প্রায় আধা ঘণ্টা করে অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
আন্দোলনকারীরা সড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের ঘটনা ঘটে। তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।
সড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধকারীরা ভাঙা ইটপাটকেল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছিল, যাতে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। কয়েকটি জায়গায় অবরোধকারীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হলেও পর্যটকদের গাড়িবহরকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিরাপদ দূরত্বে রাখা হয়েছিল।
হবিগঞ্জ থেকে আগত পর্যটক অপু তার মানসিক বিপর্যস্ততার কথা জানিয়ে বলেন, তারা দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি দূর করে কিছুটা আনন্দ উপভোগ করার উদ্দেশ্যেই পাহাড়ে ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু এখানে এসে তারা এক গভীর দুশ্চিন্তার আবর্তে পড়ে যান।
বুধবার সাজেকে পৌঁছানোর পর থেকেই আন্দোলনের কারণে তারা স্বাধীনভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেননি। সন্ধ্যা নামার পর থেকেই চারদিকে বিভিন্ন ধরনের উদ্বেগজনক খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
তারা নিরাপদে নিজেদের বাসস্থানে ফিরে যেতে পারবেন কি না, সেই চিন্তায় তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর আন্তরিক সহযোগিতায় তারা যে অক্ষত অবস্থায় খাগড়াছড়িতে পৌঁছাতে পেরেছেন, সেজন্য তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, ফেরার পথে তাদের গাড়িবহরের ঠিক সামনেই সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি টহল গাড়ি ছিল। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে অবরোধকারীদের সড়কের দুই পাশ থেকে ছত্রভঙ্গ করে দেন এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পর্যটকবাহী গাড়িগুলোকে সেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অতিক্রম করার সুযোগ করে দেন।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যটন সূত্র থেকে জানা গেছে, বুধবার রাতে সাজেকের বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজে আড়াই হাজারেরও বেশি পর্যটক অবস্থান করছিলেন। পাহাড়ি এলাকায় হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক মানুষের এই আটকে পড়ার ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনও বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিল।
বৃহস্পতিবার সকালে এই বিপুল সংখ্যক পর্যটককে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী যে লজিস্টিক ও কৌশলগত সহায়তা প্রদান করেছে, তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। পাহাড়ের এই হঠাৎ অস্থিরতা ও অবরোধের নেপথ্যে মূলত আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই দায়ী বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
জানা গেছে, সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামের দুটি স্থানীয় সংগঠন এই সড়ক অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল। জনশ্রুতি রয়েছে যে, এই সংগঠন দুটি পাহাড়ের অন্যতম আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-প্রসিত গ্রুপ) সমর্থনপুষ্ট।
এই অবরোধকারী সংগঠনগুলোর প্রধান দাবির মধ্যে অন্যতম হলো, সাজেক এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস-সন্তু গ্রুপ) সশস্ত্র সদস্যদের অবিলম্বে প্রত্যাহার বা সরিয়ে দেওয়া।
অবরোধকারীদের অভিযোগ, গত বেশ কিছুদিন ধরে পিসিজেএসএস-এর একটি সশস্ত্র দল সাজেকের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থান নিয়ে সেখানকার শান্ত পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তারা সাধারণ গ্রামবাসীদের প্রতিনিয়ত হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে বলেও অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে।
স্থানীয় সাধারণ মানুষের জানমালের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ওই এলাকাগুলো থেকে সশস্ত্র সদস্যদের বিতাড়িত করার দাবিতেই মূলত এই অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল।
তবে উদ্ভূত এই পরিস্থিতি এবং উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে আঞ্চলিক ওই সশস্ত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমগুলোতে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া প্রদান করা হয়নি।
এদিকে, পাহাড়ি এলাকায় রাজনৈতিক ও আধিপত্য বিস্তারের এই আকস্মিক সংঘাতের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের পর্যটন শিল্পের ওপর। সড়ক অবরোধ ও চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে সাজেকে বেড়াতে যাওয়া হাজার হাজার পর্যটকের আনন্দ ভ্রমণ সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত হয়েছে।
অনেকেই তাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ছুটি শেষ হওয়ার আগেই বাধ্য হয়ে আতঙ্ক নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। এর ফলে পরিবহন ভাড়া, রিসোর্টের অগ্রিম বুকিং এবং ফিরতি যাত্রার টিকিট নিয়ে পর্যটকরা যেমন ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, তেমনি ভবিষ্যতে পাহাড়ে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ভীতির সঞ্চার হয়েছে।