শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজীপুরের কাশিমপুরে পোশাক কারখানার গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:০১ পিএম

গাজীপুরের কাশিমপুরে পোশাক কারখানার গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে ফের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর থানার অন্তর্গত শৈলান এলাকায় অবস্থিত ‘সুপ্রিম গার্মেন্টস’ নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানার সুতা ও পিচবোর্ডের বাক্সের (কার্টন) গুদামে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।

 

আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আটটি ইউনিট বর্তমানে ঘটনাস্থলে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি পুরোপুরি আয়ত্তে আনতে আরও একটি ইউনিট ঘটনাস্থলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী, যেকোনো শিল্পাঞ্চলে এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু কারখানার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং সামগ্রিক শিল্প খাতের স্থিতিশীলতার জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ।

 

ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল আনুমানিক সাড়ে দশটার দিকে কারখানার ওই নির্দিষ্ট গুদামটিতে হঠাৎ করেই আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পান উপস্থিত শ্রমিক ও কর্মচারীরা।

 

মুহূর্তের মধ্যেই আগুন গুদামের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। গুদামটিতে তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ সুতা এবং প্যাকেজিংয়ের জন্য মজুত রাখা অসংখ্য খালি কার্টন থাকায় আগুনের তীব্রতা খুব দ্রুত ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

 

দাহ্য পদার্থের উপস্থিতির কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজটি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাশিমপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এই অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

 

তিনি জানান, শনিবার সকাল সাড়ে দশটার দিকে আগুন লাগার প্রাথমিক খবর পাওয়ার পরপরই কাশিমপুর মিনি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে।

 

তবে গুদামে মজুত থাকা বিপুল পরিমাণ দাহ্য বস্তুর কারণে আগুনের ভয়াবহতা ক্রমশ বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি সামাল দিতে পার্শ্ববর্তী সারাবো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে আরও তিনটি ইউনিটকে জরুরি ভিত্তিতে তলব করা হয়।

 

পরবর্তীতে আগুনের ব্যাপকতা বিবেচনা করে আরও তিনটি ইউনিট এই উদ্ধার ও নির্বাপণ কার্যক্রমে যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে ফায়ার সার্ভিসের মোট আটটি ইউনিট বর্তমানে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে।

 

কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে জানান যে, ঠিক কী কারণে বা কোথা থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো আগুন যেন কারখানার মূল উৎপাদন ভবন বা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়তে না পারে, তা নিশ্চিত করা।

 

আগুন সম্পূর্ণভাবে নির্বাপণ করার পর ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞ দলের তদন্তের মাধ্যমেই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হবে। কারখানার ভেতরে থাকা বিপুল পরিমাণ খালি কার্টন ও সুতার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

তবে সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো শ্রমিক বা কর্মচারীর হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং ফায়ার সার্ভিসের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে এই খাত থেকে। আর গাজীপুর হলো এই শিল্পের অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র। তাই এই অঞ্চলে যেকোনো কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তা কেবল ওই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্যই নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্যও একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

অতীতে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপে কারখানার কর্মপরিবেশ ও অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

 

অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নজরদারির ফলে বর্তমানে কারখানার মূল উৎপাদন কেন্দ্রগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ। তা সত্ত্বেও, কারখানার গুদামঘর বা সংরক্ষণাগারগুলোতে প্রায়শই কাঁচামাল এবং দাহ্য পদার্থের অরক্ষিত মজুত অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

 

সুপ্রিম গার্মেন্টসের এই অগ্নিকাণ্ড পুনরায় প্রমাণ করল যে, কারখানার মূল ভবনের পাশাপাশি গুদামঘরগুলোর অগ্নি নিরাপত্তায় আরও বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং অন্যান্য বৈশ্বিক মানবাধিকার ও শ্রমিক অধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পাঞ্চলগুলোতে সার্বক্ষণিক ও স্বয়ংক্রিয় অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে আসছে।

 

বিশেষ করে যে স্থানগুলোতে সুতা, তুলা, রাসায়নিক পদার্থ বা কার্টনের মতো অত্যন্ত দাহ্য বস্তু রাখা হয়, সেখানে ধোঁয়া শনাক্তকরণ যন্ত্র (স্মোক ডিটেক্টর) এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার সিস্টেম থাকা বাধ্যতামূলক।

 

বর্তমানে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘন কালো ধোঁয়া ও আগুনের উত্তাপের কারণে উদ্ধারকর্মীদের চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ফায়ার সার্ভিসকে সার্বিক সহায়তা প্রদান করছেন এবং উৎসুক জনতার ভিড় সামলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন।

 

আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের পর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব এবং দুর্ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তবে এই ঘটনা দেশের তৈরি পোশাক খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে।

 

শ্রমিকদের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের সুরক্ষায় মালিকপক্ষ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হয়।