শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস নির্মূলে পুলিশের ক্ষমতায়ন বাড়াতে নতুন আইন হচ্ছে: আইজিপি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম

চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস নির্মূলে পুলিশের ক্ষমতায়ন বাড়াতে নতুন আইন হচ্ছে: আইজিপি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এবার কঠোর ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্র। সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চাঁদাবাজদের সমূলে উৎপাটন করতে একটি নতুন এবং শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।

 

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্সে আয়োজিত কমিউনিটি পুলিশিং বিষয়ক এক বিশেষ সুধী সমাবেশ শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যটি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।

 

দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং পুলিশ বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে তাঁর এই ঘোষণা একটি বড় ধরনের কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে আইজিপি অত্যন্ত খোলামেলাভাবে সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা চাঁদাবাজির মূল কারণ ও এর পেছনের প্রভাবশালীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সমাজে যারা চাঁদাবাজির মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তারা মূলত অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি অথবা কোনো না কোনো অসাধু প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় থাকা পেশাদার সন্ত্রাসী।

 

এই অপরাধী চক্রের ভয়াবহতা ও প্রভাব এতই বেশি যে, সাধারণ মানুষ বা ভুক্তভোগীরা নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার ভয়ে এদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ দায়ের করতে বা প্রকাশ্যে সাক্ষ্যপ্রমাণ দিতে সাহস পান না।

 

বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্যই পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন আইনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইজিপি জানান, খুলনায় আসার পূর্বেই তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টার সঙ্গে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।

 

বর্তমানে এমন একটি আইন প্রণয়নের কাজ চলছে, যার মাধ্যমে পুলিশ কোনো ভুক্তভোগীর সরাসরি অভিযোগের অপেক্ষা না করেই নিজস্ব উদ্যোগে বা ন্যূনতম পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।

 

আগামী কিছুদিনের মধ্যেই এই নতুন আইনের খসড়া জনসমক্ষে আসবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পুলিশ এবং সাধারণ জনগণের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দূরত্বের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে স্বীকার করে নেন পুলিশের শীর্ষ এই কর্মকর্তা।

 

তিনি অকপটে জানান যে, বিগত প্রায় সতেরো বছর ধরে তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে পুলিশ বাহিনীর নানাবিধ প্রশ্নবিদ্ধ কার্যক্রমের ফলে জনগণের সঙ্গে তাদের একটি বিস্তর মানসিক ও আস্থার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

 

রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের মূল কাজ হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু সেই লক্ষ্য থেকে বাহিনীটি অনেকটা বিচ্যুত হয়ে পড়েছিল। বর্তমান সময়ে পুলিশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সেই হারানো জনআস্থা পুনরায় অর্জন করা।

 

কীভাবে পুলিশ ও সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমাজে একটি টেকসই ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে পারে, সেই লক্ষ্যেই তিনি দেশব্যাপী সফর করছেন এবং খুলনার এই সুধী সমাবেশ তারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

তিনি ঘোষণা করেন যে, জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়াতে এখন থেকে ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ ব্যবস্থা পুলিশের একটি সম্পূর্ণ আলাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক শাখা হিসেবে দেশব্যাপী তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

 

খুলনা অঞ্চলের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আইজিপি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অপরাধী নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়িয়ে খুন হচ্ছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে তারা সাধারণ মানুষকেও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার বানাচ্ছে, যা জনমনে এক ধরনের গভীর ভীতির সঞ্চার করেছে।

 

তবে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনী এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের সম্মুখীন হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে যখন পুলিশ কঠোর আইন প্রয়োগ বা প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করে, তখন সমাজের একটি অংশ পুলিশকে নিপীড়ক বা স্বৈরাচারী হিসেবে আখ্যায়িত করে।

 

আবার পরিস্থিতি শান্ত রাখার জন্য পুলিশ যদি বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকে বা কিছুটা নমনীয়তা প্রদর্শন করে, তখন তাদের দুর্বল ও অকার্যকর বলে সমালোচনা করা হয়। এই ধরনের পরস্পরবিরোধী সমালোচনা পুলিশের মনোবলকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

 

তাই আইজিপি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে একযোগে এগিয়ে আসার এবং একটি কার্যকরী পুলিশ বাহিনী গঠনে গঠনমূলক সহযোগিতা প্রদানের উদাত্ত আহ্বান জানান। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সমাজে মাদক ও কিশোর অপরাধের যে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে, সে বিষয়েও আলোকপাত করেন মো. আলী হোসেন ফকির।

 

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দীর্ঘ সতেরো বছরের অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে মাদক ব্যবসা কার্যত সমাজের একটি অঘোষিত স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছিল। মাদকের এই সর্বনাশা বিস্তারের কারণেই আজ অলিতে-গলিতে কিশোর গ্যাং বা উঠতি বয়সী সন্ত্রাসীদের উত্থান ঘটেছে, যারা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পচন ধরিয়েছে।

 

তবে বর্তমান সরকার এবং পুলিশ প্রশাসন এই ব্যাধিগুলো নির্মূল করতে ‘শূন্য সহনশীলতা’ বা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন। বর্তমানে দেশব্যাপী মাদক ব্যবসায়ী, কিশোর অপরাধী চক্র, তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

 

স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ অনুমোদনের ভিত্তিতে পুলিশি কার্যক্রমকে আরও বেশি গতিশীল, স্বচ্ছ ও বেগবান করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার আনা হচ্ছে, যাতে সমাজ থেকে এই অপরাধগুলো চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব হয়।

 

গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে আকস্মিক অবনতি ঘটেছিল, সেটির একটি বাস্তবসম্মত চিত্র গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন আইজিপি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সেই সময়টিতে একটি বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।

 

দেশের অধিকাংশ স্থানে পুলিশের কোনো উপস্থিতি বা কার্যক্রম ছিল না, যার সুযোগ নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল ও সন্ত্রাসীরা দেশজুড়ে এক অরাজক পরিস্থিতি কায়েম করার চেষ্টা করেছিল। তবে সেই ভয়াবহ অবস্থা থেকে দেশ এখন অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং বর্তমানে দেশের প্রতিটি প্রান্তে পুলিশের স্বাভাবিক ও নিয়মিত কার্যক্রম পুনরায় পুরোদমে শুরু হয়েছে।

 

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ, যেখানে বেকারত্বসহ অসংখ্য আর্থসামাজিক সমস্যা বিদ্যমান। আইজিপি অত্যন্ত বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে মন্তব্য করেন যে, এতগুলো মৌলিক সমস্যার রাতারাতি সমাধান বা জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় এক দিনে পরিবর্তন আনা কখনোই সম্ভব নয়।

 

তবে পরিস্থিতির যে দৃশ্যমান উন্নতি ঘটছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। পরিশেষে, পুলিশ বাহিনীকে একটি প্রকৃত অর্থেই মানবিক এবং জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেন মো. আলী হোসেন ফকির।

 

তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরোধ জানান, তারা যেন পুলিশকে অহেতুক ভয় না পান, বরং তাদের সঠিক পরামর্শ দিয়ে, তথ্য দিয়ে এবং গঠনমূলক সমালোচনা করে একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে সহযোগিতা করেন।

 

তবে কিছু চিহ্নিত অপরাধীর ব্যাপারে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় দেখা যায় মানবিক পুলিশিংয়ের সুযোগ নিয়ে কিছু অপরাধী আইনকে আর ভয় পাচ্ছে না। তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে তারা পুনরায় একই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে।

 

এই দুষ্টচক্র ভেঙে ফেলার জন্য পুলিশ প্রশাসন বর্তমানে নতুন ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। আইজিপি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, নতুন আইন এবং কঠোর নীতিমালার মাধ্যমে খুব শিগগিরই সমাজ থেকে চাঁদাবাজি, মাদক ও সন্ত্রাসবাদকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।