মঙ্গলবার, জানুয়ারী ২০, ২০২৬
৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হাবিপ্রবিতে টেন্ডারে অনিয়ম, উপাচার্যের বিরুদ্ধে ঘুষের নেয়ার অভিযোগ, ঠিকাদারের কথোপকথনের অডিও ফাঁস

হাবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ০৭:৪১ পিএম

হাবিপ্রবিতে টেন্ডারে অনিয়ম, উপাচার্যের বিরুদ্ধে ঘুষের নেয়ার অভিযোগ, ঠিকাদারের কথোপকথনের অডিও ফাঁস
ছবি: সংগৃহীত

দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. এনামউল্যা’র বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, ঘুষ গ্রহণ এবং RFQ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকাস্থ গেস্ট হাউজের ইন্টেরিয়র কাজের RFQ টেন্ডারকে কেন্দ্র করে এই অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে প্রশাসনিক মহল।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যানিং, ডেভেলপমেন্ট এন্ড ওয়ার্কস শাখা সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি রুমের জন্য আলাদা ওয়ার্ক অর্ডারের মাধ্যমে RFQ পদ্ধতিতে মোট ৩০ লক্ষ টাকার টেন্ডার অনুমোদন করা হয়। ভ্যাট বাদে প্রকৃত বিলের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ লক্ষ টাকা। কাজটি পায় ঢাকার ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ।

অভিযোগ রয়েছে, কাজ শেষ না হতেই RFQ কমিটি ২৩ লক্ষ টাকার চেক অনুমোদন করে এবং উপাচার্য নিজেই তা ঢাকায় নিয়ে যান। ব্যাংকে চেক ভাঙাতে ব্যর্থ হয়ে তিনি ৪ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ঠিকাদারকে ৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকার একটি চেক প্রদান করেন।

 

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় e-GP নীতিমালার লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে। সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী ৬ লক্ষ টাকার বেশি টেন্ডার e-GP (Electronic Government Procurement) পদ্ধতির মাধ্যমে দিতে হয়। কিন্তু এখানে একই প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে ভেঙে RFQ দিয়ে ৩০ লক্ষ টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে এই অনিয়ম করা হয়েছে, যা “splitting of procurement” হিসেবে আইনত নিষিদ্ধ।

 

সম্প্রতি ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটার অনুকূল বালা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলাম-এর মধ্যে একাধিক কল রেকর্ড নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তি সাংবাদিকের হোয়্যাটসঅ্যাপে পাঠান । এক রেকর্ডে তরিকুল বলেন, “ভ্যাট বাদে মোট বিল ২৩ লক্ষ টাকা। আপনি কত পাবেন?” জবাবে অনুকূল জানান, “৮ লক্ষ ২৮ হাজার টাকা।”

অন্য একটি রেকর্ডে শোনা যায়, উপাচার্য ৪ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি করেন, যা অনুকূল বালা ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে উপাচার্যের একাউন্টে জমা দিয়েছেন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, “আমি ক্যাশে দিইনি, ব্যাংকের চেকে দিয়েছি—প্রমাণ আছে।” আরও বলেন, “আমি যদি ফেঁসে যাই, দুদকে আত্মসমর্পণ করব। তখন শুধু আমি না, ভিসি সহ অনেকেই ফাঁসবে।”

 

রেকর্ডিং সংক্রান্ত বিষয়ে ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটার অনুকূল বালা-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোন রেখে দেন এবং জানান, পরে বিস্তারিত খুলে বলবেন।

RFQ কমিটির সদস্য সচিব তরিকুল ইসলাম-এর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অফিস সূত্রে জানা যায়, তিনি তাৎক্ষণিক তিনদিনের ছুটিতে গেছেন।

 

RFQ কমিটির আহ্বায়ক ও প্ল্যানিং, ডেভেলপমেন্ট এন্ড ওয়ার্কস শাখার পরিচালক প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান বাহাদুর বলেন, “বড় কোনো কাজকে ছোট ছোট ভাগে RFQ এর মাধ্যমে দেওয়া যায় এবং সেটি করা হয়েছে।” চেক অনুমোদনের বিষয়ে তিনি জানান, “কাজ চলাকালীন আংশিক টাকা পরিশোধ করা প্রচলিত আছে।”

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এনামউল্যা-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি পরে ফোন দেওয়ার কথা বলেন। পরবর্তী আবার ফোন দিলে ফোন কেটে দেন।

 

বাংলাদেশের Public Procurement Rules, 2008 অনুযায়ী RFQ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় সর্বোচ্চ ৬ লক্ষ টাকার কাজের জন্য। এখানে ৩০ লক্ষ টাকার কাজ RFQ দিয়ে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে, যা আইনত নিষিদ্ধ। ৬ লক্ষ টাকার বেশি যেকোনো সরকারি ক্রয় e-GP এর মাধ্যমে করতে হয়। হাবিপ্রবির ঘটনায় e-GP এ না দিয়ে RFQ ব্যবহারের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন হয়েছে।

পরিকল্পনা ও প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা যায়, RFQ নীতিমালায় বলা আছে, কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পরই বিল অনুমোদন করা যাবে। কিন্তু এখানে কাজ শেষ না হতেই ২৩ লক্ষ টাকার চেক অনুমোদন করা হয়েছে।

 

অডিও রেকর্ডে ঠিকাদার দাবি করেছেন, উপাচার্যকে ইউসিবি ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে উপাচার্যের ইসলামী ব্যাংকের একাউন্টে ৪ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়েছেন।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, RFQ প্রক্রিয়ার জবাবদিহিতা এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে গভীর প্রশ্ন উঠেছে।