আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সম্ভাব্য এই জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে কমিশন ইতিমধ্যেই নিজস্ব অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে আঞ্চলিক ও জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এই উদ্যোগের সত্যতা নিশ্চিত করে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে দক্ষ ও উপযুক্ত ব্যক্তি পাওয়া গেলে তাঁদের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা হতে পারে।
যদিও এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি, তবে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এবং দেশের বিশিষ্ট নির্বাচনী বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর কমিশনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। ঐতিহাসিকভাবে, সিটি করপোরেশন, উপজেলা বা পৌরসভার মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তারা রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচন বা উপ-নির্বাচনে কখনোই তাঁদের এই ভূমিকায় দেখা যায়নি। পূর্ববর্তী কমিশনগুলোর যুক্তি ছিল, মাঠ প্রশাসন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর জেলা প্রশাসকদের যতটা নিয়ন্ত্রণ থাকে, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের ততটা থাকে না, যা একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পরিচালনার অন্তরায় হতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের এই প্রথা ভেঙে এবার নতুন পথে হাঁটতে চাইছে বর্তমান কমিশন।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছে যে, রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদেরই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার মন্তব্য করেছেন, নিজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিলে কমিশন আর ত্রুটিপূর্ণ বা ব্যর্থ নির্বাচনের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে না।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও এই দাবির প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান সম্প্রতি এক সংলাপে উল্লেখ করেছেন, নির্বাচন কমিশন যদি সাহস করে নিজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন আসবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন যেকোনো যোগ্য ব্যক্তিকে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আইনগত ক্ষমতাপ্রাপ্ত।
বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশের ৩০০টি আসনের জন্য ৬৬ জন রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যাদের সবাই ছিলেন প্রশাসনের কর্মকর্তা। আগামী নির্বাচনে এই দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও শক্তিশালী নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।