শনিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫
২৯ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচন এলেই ধর্মকে ব্যবহারের অপচেষ্টা দেখা যায়- সালাহউদ্দিন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৫, ০১:২৮ পিএম

নির্বাচন এলেই ধর্মকে ব্যবহারের অপচেষ্টা দেখা যায়- সালাহউদ্দিন
ছবি: Collected

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার একটি পরিচিত অপচেষ্টা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সিনিয়র নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি ধর্মকে ব্যবহার করে সমাজে বিভেদ ও বিভ্রাট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

শনিবার (১ নভেম্বর) নারায়ণগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত ‘আজমতে সাহাবা সম্মেলন’-এ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমেদ এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশ একটি নতুন নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজ নিজ আদর্শিক ও কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করছে।

 

নারায়ণগঞ্জের এই ধর্মীয় সম্মেলনে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমাদের এই দেশে প্রায়শই দেখা যায়, নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলমান। আমরা মদিনার ইসলামে বিশ্বাস করি, আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর ইসলামে বিশ্বাস করি, কিন্তু মওদুদী-দর্শনের ইসলামে নয়। যারা ধর্মের নামে বিভেদ ও ফেতনা ছড়ায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।”

 

বিশ্লেষকদের মতে, সালাহউদ্দিন আহমেদের এই বক্তব্য, বিশেষ করে ‘মদিনার ইসলাম’ বনাম ‘মওদুদী-দর্শন’-এর তুলনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল একটি সাধারণ ধর্মীয় বিবৃতি নয়, বরং বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামীর প্রতি একটি সুস্পষ্ট ও পরোক্ষ সমালোচনামূলক বার্তা। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা তাত্ত্বিক নেতা আবুল আ'লা মওদুদীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দর্শনকে প্রায়শই ‘মওদুদী-দর্শন’ বা ‘মওদুদী ইসলাম’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

 

বাংলাদেশের ধর্মীয়-রাজনৈতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা-ভিত্তিক আলেম-ওলামা এবং দেওবন্দি দর্শনের অনুসারীরা প্রায়শই জামায়াতে ইসলামীর ধর্মীয় ব্যাখ্যার সাথে দ্বিমত পোষণ করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘মওদুদী-দর্শন’ প্রচারের অভিযোগ তোলেন। ‘আজমতে সাহাবা’ (নবীজীর সাহাবিদের মাহাত্ম্য) শীর্ষক এই সম্মেলনের মঞ্চটি মূলত কওমি ধারার আলেমদের দ্বারা আয়োজিত, যারা ঐতিহ্যগতভাবেই জামায়াতের ধর্মীয়-রাজনৈতিক দর্শনের সমালোচক।

 

বিএনপির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতার এমন একটি মঞ্চ থেকে এই ধরনের মন্তব্য করাকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিএনপির সাম্প্রতিক ক্রমবর্ধমান দূরত্বের একটি সুস্পষ্ট আদর্শিক প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন, গণভোটের সময়কাল এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) নির্বাচন পদ্ধতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির সাথে জামায়াতে ইসলামীর মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।

 

শনিবার সকালেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথক গণভোটের দাবির (যা জামায়াতের অন্যতম প্রধান দাবি) বিরোধিতা করে বলেছেন, এতে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। একই দিনে সালাহউদ্দিন আহমেদের এই ধর্মতাত্ত্বিক-রাজনৈতিক মন্তব্য প্রমাণ করে যে, বিএনপি এখন কেবল কৌশলগতভাবেই নয়, বরং আদর্শিকভাবেও জামায়াতের সাথে তার দূরত্বকে জনসমক্ষে স্পষ্ট করতে চাইছে।

 

সালাহউদ্দিন আহমেদ তার বক্তব্যে ধর্মীয় মঞ্চে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বিনয় প্রকাশ করে বলেন, এই ধরনের একটি ধর্মীয় সমাবেশে বক্তব্য রাখার যোগ্যতা তিনি রাখেন না। “আমি এখানে এসেছি বিজ্ঞ আলেম-ওলামাদের বক্তব্য শোনার জন্য,” তিনি বলেন। "যারা ইসলামকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ব্যবহার করেন না, যারা দুনিয়াবি স্বার্থের চেয়ে আখেরাতকে প্রাধান্য দেন-তারাই এখানে উপস্থিত আছেন। আমি তাদের সান্নিধ্যে থাকতে চেয়েছি।"

 

তবে, ধর্মীয় নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পাশাপাশি তিনি ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিপদ সম্পর্কেও পুনরায় সতর্ক করেন। সালাহউদ্দিন বলেন, “আমরা রাজনৈতিক আলোচনাকে স্বাগত জানাই, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় কেউ যেন আমাদের ঈমান-আকিদার কোনো ক্ষতি করতে না পারে, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।”

 

তার বক্তব্যের একটি অংশে পূর্ববর্তী ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের কড়া সমালোচনা স্থান পায়। তিনি অভিযোগ করেন, “শেখ হাসিনার সরকার ছিল ইসলাম-বিরোধী এবং মুসলিম-বিরোধী। তারা আলেম-ওলামাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে।” তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা সবাই প্রত্যক্ষ করেছি, কীভাবে তাদের রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটেছে।”

 

নারায়ণগঞ্জের এই সম্মেলন থেকে বিএনপির এই নেতা বাংলাদেশে "আদর্শ ও নীতিভিত্তিক রাজনীতি" প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে "আওয়ামী লীগের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি" সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে "মূল্যবোধ ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে একটি জাতি" বিনির্মাণ করার।

 

সামগ্রিকভাবে, সালাহউদ্দিন আহমেদের এই বক্তব্য আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করল। দলটি একদিকে যেমন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান জানাচ্ছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সাথে একটি স্পষ্ট আদর্শিক দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের 'মধ্যপন্থী' ও 'মূল্যবোধের রাজনীতিতে' বিশ্বাসী একটি দল হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। 'আজমতে সাহাবা সম্মেলন'-এর মতো একটি কওমি-ধারার মঞ্চকে বেছে নেওয়াও এই কৌশলেরই অংশ, যার মাধ্যমে বিএনপি ধর্মীয় অঙ্গনের বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সাথে সেতুবন্ধন রচনার বার্তা দিচ্ছে।