সোমবার, জুন ২৯, ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চোখের পরিবর্তনই দিচ্ছে ফ্যাটি লিভারের আগাম সংকেত

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম

চোখের পরিবর্তনই দিচ্ছে ফ্যাটি লিভারের আগাম সংকেত
ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক জীবনযাত্রার অনিয়ম ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে ফ্যাটি লিভার বা লিভারে চর্বি জমার সমস্যা বর্তমানে এক বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। শরীরের অন্যতম প্রধান অঙ্গ লিভার রক্ত পরিশোধন, বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং বিষাক্ত পদার্থ অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করে থাকে।

 

দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক পরিশ্রমহীনতা, উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ, স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসের মতো মেটাবলিক রোগের প্রভাবে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে। উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগটি প্রায় উপসর্গহীন থাকে, যার ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগটি শনাক্ত হতে অনেকটা দেরি হয়ে যায়।

 

তবে চিকিৎসকরা বলছেন, মানবদেহের আয়না হিসেবে পরিচিত চোখেই এই নীরবে ঘটে যাওয়া সমস্যার কিছু স্পষ্ট লক্ষণ প্রতিফলিত হতে পারে। ফ্যাটি লিভারের গুরুতর প্রভাব লিভারের কার্যকারিতাকে ব্যাহত করে, যার ফলে শরীরের বিলিরুবিন বিপাক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

এর ফলে চোখের সাদা অংশে হলদেটে ভাব ফুটে উঠতে পারে, যা মূলত জন্ডিসের একটি সাধারণ লক্ষণ। লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার কারণে যদি এই পরিবর্তন ঘটে, তবে তা লিভারের গুরুতর বা অ্যাডভান্সড স্টেজের ইঙ্গিত বহন করে। এ ছাড়াও ফ্যাটি লিভারের রোগীদের ক্ষেত্রে চোখের শুষ্কতা বা ড্রাই আই সিনড্রোমের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

 

লিভারের কার্যকারিতা হ্রাস পেলে শরীরে বিপাকীয় প্রদাহ বৃদ্ধি পায়, যা চোখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। এর ফলে চোখে জ্বালাভাব ও অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টির সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

অনেকেই দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ক্লান্তি ও চোখের নিচের কালো দাগকে কেবল অনিদ্রা বা মানসিক চাপের ফলাফল বলে মনে করেন। কিন্তু লিভারের সমস্যার কারণে শরীরে পুষ্টির অভাব ও বিপাকীয় ক্লান্তি তৈরি হয়, যার সরাসরি ছাপ পড়ে চোখের চারপাশে।

 

একই সঙ্গে চোখের পাতা বা চারপাশের অস্বাভাবিক ফোলাভাব শরীরে তরল জমা হওয়ার লক্ষণ হতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে ফ্যাটি লিভারজনিত মেটাবলিক ভারসাম্যহীনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এছাড়া ডায়াবেটিস বা মেটাবলিক সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ফ্যাটি লিভারের প্রভাবে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়ার ঘটনাও বিরল নয়।

 

যদিও চোখের এই পরিবর্তনগুলো নিশ্চিতভাবে ফ্যাটি লিভারের উপসর্গ নয়, তবে এগুলো শরীরের অভ্যন্তরীণ জটিলতার ইঙ্গিত হিসেবে অবশ্যই গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত। ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি মূলত সেইসব ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, যারা শারীরিক পরিশ্রম কম করেন, প্রচুর পরিমাণে চিনিযুক্ত পানীয় ও জাঙ্ক ফুড গ্রহণ করেন এবং যাদের ওজন ও কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।

 

প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগটি শনাক্ত করতে না পারার কারণে রোগী দীর্ঘমেয়াদী জটিলতার দিকে ধাবিত হন। তাই দীর্ঘদিন শরীরে অস্বাভাবিক ক্লান্তিভাব, চোখের রঙে পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক ফোলাভাব দেখা দিলে অবহেলা না করে লিভার ফাংশন টেস্ট ও আল্ট্রাসোনোগ্রাফির মতো পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া জরুরি। সময়মতো শনাক্তকরণ এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায়।

 

ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধের প্রধান চাবিকাঠি হলো জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন। সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের মাধ্যমে লিভারকে সুস্থ রাখা সম্ভব। খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি, তাজা ফলমূল এবং আঁশযুক্ত খাবার যেমন ওটস অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

 

সেই সঙ্গে চিনি, মিষ্টি, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এবং কোমল পানীয় খাদ্যতালিকা থেকে ছেঁটে ফেলতে হবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ। প্রতিদিন অন্তত ত্রিশ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা দ্রুত হাঁটা বা নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি লিভারের চর্বি গলাতে সাহায্য করে।

 

এছাড়া পর্যাপ্ত ঘুম এবং ক্ষতিকর অভ্যাস যেমন ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে পুরোপুরি দূরে থাকাও লিভারের কার্যকারিতা পুনরুদ্ধারের জন্য অপরিহার্য। শরীরের যে কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণকে উপেক্ষা না করে সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ফ্যাটি লিভারের মতো নীরব ঘাতককে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।