বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলতি বছর নয়, আগামী বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫১ পিএম

চলতি বছর নয়, আগামী বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন চলতি বছরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক পরিকল্পনা ও সার্বিক পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণ করে সরকার মনে করছে, আগামী বছরের প্রথমার্ধেই এই নির্বাচনগুলো আয়োজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

 

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, সাংবিধানিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত স্বাধীন সংস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশন আগামী বছরের ৬ জুনের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

 

ফলে চলতি পঞ্জিকাবর্ষে কোনো নির্বাচনের সম্ভাবনা দৃশ্যমান নয় এবং আগামী বছর থেকেই এই নির্বাচনি কার্যক্রম কার্যকরভাবে শুরু হতে যাচ্ছে বলে সুস্পষ্ট আভাস পাওয়া গেছে। বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেওয়ার সময় প্রতিমন্ত্রী সরকারের এই পর্যবেক্ষণ ও সামগ্রিক প্রস্তুতির চিত্র বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সীমা ও রূপরেখা নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে নানামুখী আলোচনা চলছে। নির্বাচন কমিশন প্রথমে একটি প্রাথমিক সময়সীমার কথা ভাবলেও পরবর্তীতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর জানিয়েছে যে, তারা আগামী অর্থবছরের নির্দিষ্ট সময়সীমা অর্থাৎ ৬ জুনের ভেতরেই সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু ও সফলভাবে সমাপ্ত করতে চায়।

 

এই বাস্তবতার আলোকে সরকারও মনে করছে, নির্বাচন প্রক্রিয়া মাঠে গড়াতে এখনো কিছুটা সময় বাকি রয়েছে এবং যাবতীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রস্তুতি সেই নির্ধারিত সময়ের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করেই সাজানো হচ্ছে।

 

নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক সীমাবদ্ধতার দিকটি বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের তৃণমূল স্তরের নির্বাচন পরিচালনায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা সরাসরি ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

 

আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বরে সারা দেশের স্কুলগুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর শুরু হবে নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক ব্যস্ততা এবং পরবর্তী সময়ে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট বা এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি আসন্ন পবিত্র রমজান মাসের ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা অপরিহার্য।

 

এই সকল গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় শিক্ষাক্রম, পাবলিক পরীক্ষা ও ধর্মীয় অনুভূতির কথা বিবেচনা করেই সম্ভবত নির্বাচন কমিশন তাদের সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করেছে, যাতে সাধারণ ভোটার, শিক্ষার্থী ও পরীক্ষা পরিচালনাকারীদের কোনো ধরনের দুর্ভোগ বা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে না হয়।

 

আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও সরকারি সহযোগিতার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, শুরুতে সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত না জানিয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে কিছু তারিখের প্রাথমিক আভাস দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি সরকারের নজরে আসার পর কমিশন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি যৌথ সচিব পর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক আহ্বান করে।

 

সেই সমন্বয় সভায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং মাঠপর্যায়ের সার্বিক বাস্তবতা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ প্রদান করেন।

 

ওই বৈঠকের সিদ্ধান্তের আলোকেই নির্বাচন কমিশন পরবর্তীতে গণমাধ্যমের কাছে স্পষ্ট করেছে যে, চলতি অর্থবছরের নির্ধারিত সময়সীমা অর্থাৎ ৬ জুনের মধ্যে সব নির্বাচন শেষ করা হবে। এই বৃহৎ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সফলভাবে পরিচালনার দায়িত্ব যেহেতু কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সচিবরা কমিশনের সঙ্গে আবারও আনুষ্ঠানিক সংলাপে বসবেন।

 

নির্বাচন আয়োজনে জাতীয় অর্থনীতির ওপর যে বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হয়, সে বিষয়েও সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, স্থানীয় সরকারের পাঁচটি ভিন্ন স্তরের নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশন সরকারের কাছে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার একটি সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব বা আর্থিক রূপরেখা উপস্থাপন করেছে।

 

সরকার এই গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখতে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছে এবং বাজেটে সেই অনুযায়ী সংস্থান রাখা হয়েছে। এই ব্যয়ের হিসাবটি চূড়ান্তভাবে কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে, তবে কমিশনের উপস্থাপিত সম্ভাব্য চাহিদাকেই ভিত্তি হিসেবে ধরে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।

 

এই বিশাল আর্থিক ব্যয়ের খাতভিত্তিক বিভাজন তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সামগ্রিক বাজেটের সিংহভাগই ব্যয় হবে ইউনিয়ন পরিষদ এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে। দেশের তৃণমূলের সবচেয়ে বড় ও বিস্তৃত স্তর হওয়ায় কেবল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করতেই প্রায় দুই হাজার সাত শত থেকে দুই হাজার আট শত কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

 

একইভাবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ব্যয় হতে পারে প্রায় দুই হাজার দুই শত থেকে দুই হাজার তিন শত কোটি টাকা। এই দুটি স্তরেই মূল জনবল, ব্যালট পেপার, পরিবহন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়।

 

বিপরীতে দেশের ৩৩০টি পৌরসভা এবং মাত্র ১৩টি সিটি কর্পোরেশনের মতো অপেক্ষাকৃত সীমিত ও সুনির্দিষ্ট নগর এলাকাগুলোতে নির্বাচনের পেছনে তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম অর্থ ব্যয় হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

সম্প্রতি দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় বা বৃদ্ধির কারণে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়বে কি না—এমন এক রাজনৈতিক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিপক্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন।

 

তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যসংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট জ্বালানি মন্ত্রী ইতোমধ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তবে নির্বাচনি রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গেলে মনে রাখতে হবে যে, এখনো কোনো নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ কমিশন কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

 

যেহেতু ভোটগ্রহণের দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়নি এবং প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে এখনো বেশ কয়েক মাস সময় বাকি রয়েছে, সেহেতু বর্তমান মুহূর্তে এই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ মানুষের মনোভাব বা প্রতিক্রিয়ায় কী পরিবর্তন আসবে, তা অগ্রিম নিশ্চিত করে বলা একেবারেই সমীচীন নয়।

 

নির্বাচনের সঠিক আবহ তৈরি হলে এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে দৃশ্যমান হলেই কেবল ভোটারদের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হবে। নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণার একচ্ছত্র সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সংযত ও দায়িত্বশীল অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

 

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, সরকার কখনোই নির্বাচনের নির্দিষ্ট সূচি বা শুরুর তারিখ নিজ থেকে ঘোষণা করতে চায় না। কারণ স্বাধীন সংস্থা হিসেবে নির্বাচন নিজেই সম্পূর্ণভাবে এই ভোট পরিচালনা করবে।

 

সরকার যদি নিজ উদ্যোগে নির্বাচনের দিন বা তারিখ নির্ধারণের ঘোষণা দিতে যায়, তবে তা নির্বাচন কমিশনের পেশাদারিত্ব, স্বাধীনতা ও মর্যাদার জন্য চরম অস্বস্তিকর এবং বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। সরকারের নীতিগত চাওয়া কেবল একটাই-চলতি অর্থবছরের মধ্যে যেন সব নির্বাচন স্বচ্ছতার সঙ্গে সমাপ্ত হয়।

 

তবে ঠিক কোন দিনে কোন স্তরের নির্বাচন শুরু হবে এবং কীভাবে তা সমাপ্ত হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক এখতিয়ার একমাত্র নির্বাচন কমিশনেরই রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে প্রতিমন্ত্রী জানান, চলতি মাসের শেষভাগে অথবা আগামী অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন কমিশন সরকারের অংশীজনদের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আয়োজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

সেই নীতিনির্ধারণী সভায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মনোনীত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন এবং কমিশনের সঙ্গে বিস্তারিত পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত নির্বাচনি রোডম্যাপ ও রূপরেখা প্রণয়নে সহায়তা করবেন।

 

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারের পক্ষ থেকে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সকল ধরনের বিভ্রান্তি ও জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিত পথেই আগামী বছরের প্রথমার্ধে একটি গ্রহণযোগ্য, অর্থবহ ও অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রযন্ত্র তার প্রশাসনিক প্রস্তুতি অব্যাহত রাখছে।