মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণপরিবহনের ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়াল সরকার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম

গণপরিবহনের ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়াল সরকার
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজার ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির নানা সমীকরণের মধ্যে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যবস্থায়।

 

ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি একলাফে ২০ টাকা বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তের পর এবার অনিবার্যভাবেই সারা দেশে গণপরিবহনের ভাড়াও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাস এবং রাজধানী ঢাকাসহ মহানগরগুলোতে চলাচলকারী সাধারণ বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা করে বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ-এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রস্তাবনার পর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এই ভাড়ার হার চূড়ান্ত করেছে এবং আজই এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

 

পরিবহন খাতে ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ অর্থনৈতিক সূত্র অনুসরণ করা হয়ে থাকে। সাধারণত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে এক টাকা বৃদ্ধি পেলে বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি এক পয়সা বাড়ানোর একটি প্রথাগত রেওয়াজ রয়েছে।

 

সেই হিসাব অনুযায়ী, গত ২০ সেপ্টেম্বর যখন ডিজেলের মূল্য লিটারে ২০ টাকা একলাফে বাড়ানো হলো, তখন পরিবহন মালিকদের দাবির মুখে বিআরটিএ প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনা সরকারের নীতি-নির্ধারকদের কাছে জমা দিয়েছিল।

 

তবে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির সার্বিক চাপের কথা গভীরভাবে বিবেচনা করে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত ২০ পয়সার পরিবর্তে কিছুটা কমিয়ে ১৭ পয়সা বাড়ানোর চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছে।

 

সরকারের এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন পরিবহন মালিকদের বাড়তি খরচের চাপ কিছুটা লাঘব করবে, অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীদের ওপরও হঠাৎ করে যেন বিশাল অঙ্কের ভাড়ার বোঝা না চাপে, সেদিকে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

 

নতুন এই ভাড়ার হার কার্যকর হওয়ার পর যাত্রীদের ঠিক কত টাকা বাড়তি গুনতে হবে, তার একটি স্পষ্ট রূপরেখাও ইতিমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে রাজধানী ঢাকা এবং বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম মহানগরে চলাচলকারী সাধারণ বড় বাসের কিলোমিটারপ্রতি নির্ধারিত ভাড়া হচ্ছে দুই টাকা ৫৩ পয়সা।

 

নতুন করে ১৭ পয়সা যুক্ত হওয়ার পর মহানগর এলাকায় এই বাসের ভাড়া বেড়ে দাঁড়াবে দুই টাকা ৭০ পয়সায়। অন্যদিকে, মহানগরে চলাচলকারী মিনিবাসের বর্তমান ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি দুই টাকা ৪২ পয়সা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হবে দুই টাকা ৫৯ পয়সা।

 

মহানগরীর সীমানা পেরিয়ে দূরপাল্লার রুটের ক্ষেত্রেও ভাড়ার এই নতুন হার প্রযোজ্য হবে। দূরপাল্লার ৫২ আসনের বড় বাসের ক্ষেত্রে বর্তমানে কিলোমিটারপ্রতি যাত্রীদের গুনতে হয় দুই টাকা ২৩ পয়সা। নতুন প্রজ্ঞাপনটি কার্যকর হলে দূরপাল্লার যাত্রীদের প্রতি কিলোমিটারে দুই টাকা ৪০ পয়সা হারে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।

 

ভাড়া বৃদ্ধির এই নতুন সিদ্ধান্তটি মূলত শুধুমাত্র ডিজেলচালিত সাধারণ বাস এবং মিনিবাসের ক্ষেত্রেই কঠোরভাবে প্রযোজ্য হবে। সরকারি নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা এসি বাসের ভাড়া সরকার সরাসরি নির্ধারণ করে না।

 

এসি বাসের ক্ষেত্রে পরিবহন মালিকরা সেবার মান এবং বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ভাড়া নির্ধারণ করে থাকেন। ঠিক একইভাবে দেশের পণ্য সরবরাহ চক্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বা অন্যান্য পণ্যবাহী বাণিজ্যিক যানবাহনের ভাড়াও সরকারিভাবে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় না।

 

পণ্য পরিবহনের ভাড়াও মূলত মুক্তবাজার অর্থনীতির চাহিদা ও জোগানের নীতির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। ফলে নতুন করে জারি হতে যাওয়া এই ১৭ পয়সা বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপনটি এসি বাস বা পণ্যবাহী যানের ক্ষেত্রে আইনগতভাবে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

 

তবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে এসব ক্ষেত্রেও যে পরোক্ষভাবে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, তা সহজেই অনুমেয়। ভাড়া নির্ধারণের এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক হিসাব এবং বাসের আসন সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে করা হয়ে থাকে।

 

বিআরটিএ-এর হিসাব অনুযায়ী, নতুন ভাড়ার এই কাঠামোটি প্রস্তুত করার সময় ৫২ আসনের বড় বাস এবং ৩০ আসনের মিনিবাসকে একটি আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের পরিবহন খাতের বাস্তবতায় দেখা যায়, দূরপাল্লার অনেক পরিবহন কোম্পানি যাত্রীদের যাতায়াত আরও আরামদায়ক এবং বিলাসবহুল করতে বাসের ভেতরের আসন সংখ্যা ৫২ থেকে কমিয়ে ৪০ বা তারও নিচে নামিয়ে আনে।

 

আসন সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি আসনের মাথাপিছু পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলশ্রুতিতে, যেসব বাসে আসন সংখ্যা ৫২-এর কম, সেসব পরিবহনের ক্ষেত্রে যাত্রীদের ভাড়ার পরিমাণ আনুপাতিক হারে কিছুটা বেশি হতে পারে বলে বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে।

 

এটি পরিবহন সেবার মান এবং যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যের মূল্যের একটি প্রতিফলন। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকারের এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত আকস্মিক নয়, বরং বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সমন্বয়ের একটি ধারাবাহিক অংশ।

 

এর ঠিক কয়েক মাস আগে, চলতি বছরের এপ্রিলে সরকার যখন ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়েছিল, তখনও পরিবহন খাতে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছিল। সেই সময় বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা করে বাড়ানো হয়েছিল।

 

আর সর্বশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে এক সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের এমন ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন খাতের পরিচালন ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার চূড়ান্ত আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিকদেরই বহন করতে হচ্ছে।

 

আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারির পর এই নতুন ভাড়া মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার এবং বিআরটিএ-কে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বিআরটিএ-এর সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, দূরপাল্লার রুট এবং শহরের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটের দূরত্ব নিখুঁতভাবে মেপে নতুন ভাড়ার একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত করার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

 

তবে সারা দেশের হাজার হাজার রুটের ভাড়ার তালিকা নির্ভুলভাবে প্রস্তুত করে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে আরও অন্তত এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেন কোনো পরিবহন মালিক বা শ্রমিক যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক ভাড়া আদায় করতে না পারে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।

 

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, জ্বালানির দাম বাড়লে অনেক সময় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও বেশি অর্থ আদায়ের একটি অনৈতিক প্রবণতা তৈরি হয়। এসব নৈরাজ্য ঠেকাতে প্রশাসনকে এবার কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

 

পরিশেষে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির এই ঘটনাটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

 

যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধির কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ, শিক্ষার্থী এবং নিয়মিত কর্মজীবীদের মাসিক বাজেটে একটি বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে। সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-ঘোষিত ভাড়ার বাইরে যেন সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে এক পয়সাও বেশি আদায় করা না হয়, তা কঠোর হস্তে দমন করা।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণেও এটি উঠে আসে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জ্বালানি ও পরিবহনের দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে সরাসরি উসকে দেয়। তাই ভাড়া বৃদ্ধির এই সরকারি সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে কতটা স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, এখন সেদিকেই সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন দেশের আপামর জনসাধারণ।