সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি

বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৪৮ পিএম

বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যে ব্যাপক ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে জনজীবনে যে গভীর অর্থনৈতিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে গণপরিবহনের ভাড়ায় নতুন করে সমন্বয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি।

 

দেশজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় গণপরিবহন একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও অপরিহার্য খাত। এই খাতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাধারণ যাত্রীদের ওপর। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরিবহন মালিক ও সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সিটি সার্ভিস অর্থাৎ মহানগর এলাকার বাস এবং দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে যাত্রীপ্রতি প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা করে ভাড়া বাড়ানোর একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা গৃহীত হয়েছে।

 

তবে সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের কথা বিবেচনা করে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া পূর্বের মতোই ১০ টাকা এবং মিনিবাসের ক্ষেত্রে ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখার একটি স্বস্তিদায়ক সুপারিশও করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে প্রায়শই দেখা যায়, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির হার মারাত্মক আকার ধারণ করে, যার প্রথম ধাক্কাটি আসে পরিবহন খাত থেকে।

 

সোমবার দুপুরে রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির প্রধান কার্যালয়ে ভাড়া সমন্বয় কমিটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘায়িত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন খাতের সার্বিক ব্যয়ভার এবং যাত্রীদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়।

 

পরিবহন মালিকদের প্রতিনিধি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটিতে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের প্রতিটি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করা হয়েছে। পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিরা জানিয়েছেন যে, পরিবহন মালিকেরা শুরুতে তাদের বর্ধিত ব্যয়ের যুক্তি দেখিয়ে আরও বেশি হারে ভাড়া বাড়ানোর পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন।

 

মালিকপক্ষের প্রাথমিক দাবি ছিল প্রতি কিলোমিটারে অন্তত ৪০ পয়সা হারে ভাড়া বৃদ্ধি করা। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সাধারণ যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষার্থে কমিটির অন্যান্য সদস্যদের জোরালো যুক্তিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা বৃদ্ধির একটি মধ্যবর্তী সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়েছে।

 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এএসএম আহমেদ খোকন এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে গণমাধ্যমের কাছে তাদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বিশ্ববাজার এবং দেশীয় প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখেই কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর এই যৌক্তিক প্রস্তাবটি প্রদান করা হয়েছে।

 

পরিবহন খাতের এই জ্যেষ্ঠ নেতার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে পেশ করা এই নতুন প্রস্তাব যদি মন্ত্রণালয় কর্তৃক চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়, তবে আন্তঃজেলা বা দূরপাল্লার বাসের ভাড়া বর্তমানের কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সায় গিয়ে দাঁড়াবে।

 

অন্যদিকে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো জনবহুল মহানগরীগুলোতে চলাচলকারী সিটি বাসের ভাড়া বর্তমানের ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২ টাকা ৭৩ পয়সা হিসেবে নির্ধারিত হবে। পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে এই সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাটি ইতোমধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

এখন সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই নতুন এই ভাড়ার হার আইনি বৈধতা লাভ করবে।

 

সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র এবং পরিবহন খাতের নীতিনির্ধারকদের ধারণা অনুযায়ী, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবারের মধ্যেই নতুন ভাড়ার হার সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

 

প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর থেকেই দেশব্যাপী এই নতুন ভাড়ার তালিকা কার্যকর হবে এবং পরিবহন শ্রমিকরা আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রীদের কাছ থেকে বর্ধিত ভাড়া আদায় করতে পারবেন। তবে প্রজ্ঞাপন জারির পূর্বেই কোনো কোনো রুটে বাড়তি ভাড়া আদায়ের যে অভিযোগ প্রায়শই ওঠে, সেটি কঠোরভাবে রোধ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় মাঠে রাখা হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

 

গণপরিবহনে নতুন করে এই ভাড়া বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে মূলত গত রোববার রাতে সরকারের নেওয়া একটি আকস্মিক সিদ্ধান্তের কারণে। ওই দিন রাতে সরকারের পক্ষ থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশে ব্যবহৃত প্রধান চারটি জ্বালানি তেলের দাম একযোগে বিপুল পরিমাণে বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ কমানোর যুক্তি দেখিয়ে প্রতিটি জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি এক লাফে ২০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা দেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্য একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

সরকারের এই নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, বহুল ব্যবহৃত ডিজেলের দাম পূর্বের ১১৫ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকায় পৌঁছেছে। প্রান্তিক মানুষের নিত্যব্যবহার্য কেরোসিনের দামও ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহনে ব্যবহৃত অকটেনের দাম ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১৪০ টাকা থেকে লাফিয়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। নতুন এই বর্ধিত মূল্যতালিকা সোমবার ভোর থেকেই দেশজুড়ে কার্যকর করা হয়েছে, যার ফলে গণপরিবহন খাত থেকে শুরু করে কৃষিসেচ এবং শিল্প উৎপাদনে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

 

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গণপরিবহন ব্যবস্থার একটি বিশাল অংশ, বিশেষ করে দূরপাল্লার বিলাসবহুল বাস থেকে শুরু করে সাধারণ সিটি বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান-এগুলোর প্রায় সবই মূলত ডিজেলচালিত ইঞ্জিন দিয়ে পরিচালিত হয়।

 

ফলশ্রুতিতে, ডিজেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো পরিবহন খাতের পরিচালনা ব্যয় জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়া। বাস মালিকদের দাবি, কেবল জ্বালানি তেলই নয়, এর পাশাপাশি ইঞ্জিন অয়েল, গাড়ির মেকানিক্যাল যন্ত্রাংশ, টায়ার এবং পরিবহন শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বিগত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির কারণে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

এই বহুমুখী বাড়তি ব্যয়ের বোঝা কোনোভাবেই পরিবহন মালিকদের পক্ষে এককভাবে দীর্ঘকাল বহন করা সম্ভব নয়। ঠিক এই সার্বিক অর্থনৈতিক বিবেচনা থেকেই অতি দ্রুততার সঙ্গে নতুন করে বাসের ভাড়া সমন্বয় বা পুনর্নির্ধারণের এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

রবিবারের এই দীর্ঘ পর্যালোচনা বৈঠকে কেবল জ্বালানি খাতের বর্ধিত খরচই নয়, বরং একটি বাস রাস্তায় নামাতে আনুষঙ্গিক যত ধরনের যাতায়াত এবং পরিচালনা ব্যয় রয়েছে, তার সবকিছুই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন ভাড়া সমন্বয় করার এই ঘটনা বাংলাদেশে এবারই প্রথম নয়; বরং এটি একটি চলমান অর্থনৈতিক চক্রের অংশ। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলেও আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম এক দফা বৃদ্ধি করা হয়েছিল, যার প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে বাসের ভাড়াও সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছিল সরকার।

 

সে সময় ডিজেলের দাম এক ধাক্কায় লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১১৫ টাকায় উন্নীত হয়েছিল। জ্বালানির সেই ঊর্ধ্বগতির কারণে গত ২৩ এপ্রিল তারিখে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ভাড়ার নতুন হার নির্ধারণ করেছিল।

 

ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সে সময় দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা করা হয়েছিল। একইভাবে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের অভ্যন্তরে চলাচলকারী বাসের ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বৃদ্ধি করে ২ টাকা ৫৩ পয়সা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে চলাচলকারী মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল।

 

জ্বালানি তেলের দামের এই ধারাবাহিক অস্থিতিশীলতার ইতিহাস আরও পেছনে তাকালে অর্থনৈতিক নীতিমালার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে এখনও ২০২২ সালের আগস্ট মাসের সেই ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের কথা সতেজ রয়েছে।

 

ওই সময় বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণ দেখিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ডিজেলের দাম এক লাফে ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। দামের সেই চরম উল্লম্ফনের ফলে পরিবহন খাতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং সরকার বাধ্য হয়ে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ৪০ পয়সা এবং মহানগর এলাকায় চলাচলকারী বাসের ভাড়া ৩৫ পয়সা বৃদ্ধি করেছিল।

 

পরবর্তীতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা হ্রাস পাওয়ায় ওই বছরের ৩১ আগস্ট সরকার ডিজেলের দাম নামমাত্র ৫ টাকা কমিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ২০ পয়সা থেকে সামান্য কমিয়ে ২ টাকা ১৫ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪৫ পয়সা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছিল।

 

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসেও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি মাত্র ৩ টাকা কমার পরও সরকারের পক্ষ থেকে ভাড়ায় সামান্য সমন্বয়ের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে যে দ্রুততায় ভাড়া বৃদ্ধি পায়, দাম কমলে তার সুফল সাধারণ যাত্রীদের কাছে সেভাবে পৌঁছায় না, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।