সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিতর্কিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের রহস্যজনক মৃত্যুর পর এবার আইনি প্রক্রিয়ার ফাঁস ক্রমশই কঠোর হচ্ছে। এই তরুণীর আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে আরও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ।
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমের কাছে এই রিমান্ড আবেদনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটির পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক নির্যাতনের প্রমাণ রয়েছে কি না, তা উদ্ঘাটনের জন্য আসামিদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা অত্যন্ত জরুরি।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে এই রিমান্ড আবেদনের ওপর বিস্তারিত শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা, শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এই আবেদনটি আদালতে জমা দিয়েছেন।
এই চাঞ্চল্যকর মামলার সূত্রপাত ঘটে গত রোববার। ওই দিন শেরেবাংলা নগর থানাধীন সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাসভবন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি সরকারি ভবনের ভেতরে একজন সংসদ সদস্যের স্ত্রীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই সারা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ঘটনার পরপরই মৃত মরিয়ম খাতুনের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা দায়ের করেন।
একজন অসহায় পিতা হিসেবে তিনি তাঁর মেয়ের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য সরাসরি যাদের দায়ী করেছেন, তাদের মধ্যে প্রধান আসামি করা হয়েছে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে। একই সাথে এই মামলায় অপর দুই আসামি হিসেবে নাম উল্লেখ করা হয়েছে এমপির প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং মরিয়ম খাতুনের নিজের মামা ও এমপির গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানের।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত জুন মাসে সম্পূর্ণ ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সাথে মরিয়ম খাতুনের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর থেকেই মরিয়ম তাঁর স্বামী ও সতিনের সাথে মানিক মিয়া এভিনিউ সংলগ্ন সংসদ ভবনের ঠিক বিপরীত পাশে অবস্থিত ন্যাম ভবনের ওই সুনির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে বসবাস করে আসছিলেন।
তবে এই বিয়ে স্বাভাবিক কোনো প্রক্রিয়ায় হয়নি বলে দাবি করেছেন নিহত তরুণীর বাবা। তিনি অভিযোগ করেন যে, মামলার তৃতীয় আসামি ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ ও জোরালো প্ররোচনাতেই গাজী নজরুলের সাথে মরিয়মের বিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু বিয়ের পর থেকেই মরিয়মের জীবনে নেমে আসে চরম অশান্তি ও নির্যাতনের কালো ছায়া। এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিষয়কে কেন্দ্র করে গাজী নজরুল এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম মিলে মরিয়মের ওপর অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন।
মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাঁর নিজের পরিবারকে এই নির্মম নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন এবং বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন। ঘটনার দিন, অর্থাৎ ২০ সেপ্টেম্বর বিকেলের বর্ণনা দিতে গিয়ে মামলার বাদী মো. মাসুম বিল্লাহ এজাহারে উল্লেখ করেন, বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল হঠাৎ করেই তাঁকে মোবাইল ফোনে কল করেন এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাঁদের ন্যাম ভবনের বাসায় ছুটে আসতে বলেন।
মেয়ের বিপদের কথা আঁচ করতে পেরে তিনি তড়িঘড়ি করে সেখানে ছুটে যান। বাসায় পৌঁছে তিনি দেখতে পান যে, ফ্ল্যাটের ভেতরে আগে থেকেই অনেক মানুষের ভিড় জমে আছে। সেখানে উপস্থিত লোকজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন যে, তাঁর আদরের মেয়ে মরিয়ম ভেতরের একটি রুমের দরজা বন্ধ করে ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছেন।
এরপর শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশের একটি দল সেখানে উপস্থিত হয়। পুলিশের প্রত্যক্ষ সহায়তায় রুমের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করার পর উপস্থিত সকলেই একটি মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে পান। ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় মরিয়মের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।
ওই একই সময়ে ঘরের বিছানার ওপর থেকে মরিয়মের নিজ হাতে লেখা একটি সুইসাইড নোট বা আত্মহত্যার চিরকুট উদ্ধার করে পুলিশ, যা এই মামলার তদন্তের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এজাহারে পিতা মাসুম বিল্লাহ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে অভিযোগ করেছেন যে, আসামিদের দীর্ঘদিন ধরে চালানো অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং তাদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনাতেই তাঁর মেয়ে আত্মহত্যার মতো এমন একটি চরম ও মর্মান্তিক পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এই ঘটনার পেছনে কেবল পারিবারিক কলহ নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে সাম্প্রতিক সময়ের একটি বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক কেলেঙ্কারির ইতিহাস। উল্লেখ্য, গত জুলাই মাসে এই মরিয়ম খাতুনের সাথেই সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের কিছু ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিও ফাঁসের ওই ঘটনাটি সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিব্রতকর ঘটনার পরপরই গত ২২ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এই সংসদ সদস্যকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
দলটির পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল যে, তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক তদন্তে গাজী নজরুল ইসলামের নৈতিক স্খলনের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা কঠোরভাবে প্রয়োগ করে তাঁকে বহিষ্কার করা হয় এবং একই সাথে নির্বাচন কমিশনকেও এই বহিষ্কারাদেশের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করা হয়, যাতে তাঁর সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
ভিডিও ফাঁসের ওই ঘটনার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে এবং সেটি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ওই অনৈতিক সম্পর্কের তীব্র প্রতিবাদ জানানো এবং ভিডিওটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁস করার সন্দেহে গত ২১ জুলাই পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
সেই মামলার বাদী ছিলেন এমপির গাড়িচালক এবং মৃত মরিয়ম খাতুনের আপন মামা ওবায়দুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, প্রতিবাদ করায় তাঁকে মারধর করা হয়েছে এবং শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছে।
এই হত্যাচেষ্টা মামলায় গত ১০ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে আট সপ্তাহের আগাম জামিন লাভ করেছিলেন সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু ভাগ্যের এক নির্মম পরিহাস হলো, যে ওবায়দুর রহমান কয়েক মাস আগে এমপির বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেছিলেন, সেই একই ওবায়দুর রহমান এবার নিজের ভাগ্নি মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় সেই একই এমপির সাথে সহ-আসামি হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছেন।
আইনি মারপ্যাঁচ এবং পারিবারিক সম্পর্কের এই চরম অবনতি ঘটনাটিকে আরও বেশি জটিল ও রহস্যময় করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাম ভবনের মতো একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত এলাকায় একজন সংসদ সদস্যের বাসভবনে এমন একটি মৃত্যুর ঘটনা কেবল একটি সাধারণ আত্মহত্যা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
এর সাথে ক্ষমতা, নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক নির্যাতন এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো গুরুতর অপরাধের সরাসরি যোগসূত্র থাকতে পারে বলে অনেকেই সন্দেহ করছেন। উদ্ধারকৃত সুইসাইড নোটটির ফরেনসিক পরীক্ষা, আসামিদের রিমান্ডে এনে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফ্ল্যাটের অন্যান্য বাসিন্দাদের সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইনি মানদণ্ড অনুযায়ী, অভিযুক্তরা যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, তদন্ত প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাখতে হবে। পুলিশ যদি আদালত থেকে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করাতে সক্ষম হয়, তবে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হয়তো বেরিয়ে আসবে কীভাবে একজন তরুণীকে ক্ষমতার দাপট ও পারিবারিক নির্যাতনের যাঁতাকলে পিষ্ট করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
দেশবাসী এখন আদালতের পরবর্তী নির্দেশ এবং পুলিশের বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে, যাতে মরিয়ম খাতুন ন্যায়বিচার পান এবং অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি লাভ করে।