দেশে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুতের প্রসার ঘটাতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে এক হাজার পাঁচশত কোটি টাকার একটি বিশাল ও সহজলভ্য ঋণ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
মূলত গৃহস্থালি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, এর সম্প্রসারণ এবং আধুনিকায়নের লক্ষ্যে এই বিপুল অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগের রাজস্ব নীতি শাখা থেকে সম্প্রতি জারি করা একটি বিশেষ পরিপত্রের মাধ্যমে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে প্রণীত এই সময়োপযোগী উদ্যোগ দেশের বিদ্যুৎ খাতে এক নবদিগন্তের সূচনা করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা ওই নির্দেশিকার তথ্য অনুযায়ী, এই পরিবেশবান্ধব ঋণ কর্মসূচির আওতায় সরকার বার্ষিক মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ হারে সুদ নির্ধারণ করেছে।
তবে সব ধরনের আনুষঙ্গিক খরচ, প্রক্রিয়াকরণ ফি এবং অন্যান্য আর্থিক মাশুল অন্তর্ভুক্ত করার পর চূড়ান্ত পর্যায়ে গ্রাহকদের জন্য সর্বোচ্চ কার্যকর বার্ষিক সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ছয় শতাংশ। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর চড়া সুদের হারের সঙ্গে তুলনা করলে এই হার অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সাশ্রয়ী।
এর ফলে সাধারণ গৃহস্থালি থেকে শুরু করে বৃহৎ শিল্প উদ্যোক্তারাও অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে এই ঋণ গ্রহণ করে নিজেদের স্থাপনায় পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের বিদ্যুৎ খরচ অভাবনীয় হারে কমিয়ে আনবে।
এই সুবিশাল অর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় মূলত গৃহস্থালি, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় এবং বৃহৎ শিল্প খাতে বহুমুখী সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান খাত হলো বাসাবাড়ি ও বহুতল বাণিজ্যিক ভবনের অব্যবহৃত ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন এবং তার যৌক্তিক সম্প্রসারণ।
এছাড়া, বিদ্যুৎ বিনিময় ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এই সহজ ঋণ ব্যবহার করা যাবে, যার মাধ্যমে গ্রাহকরা নিজেদের উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবেন।
দেশের যে সকল প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছায়নি, সেখানে বাসাবাড়ির নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনেও এই বিশাল অর্থায়ন এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। শুধু বাসাবাড়ি বা শিল্পকারখানাই নয়, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি খাতকেও এই ঋণ কর্মসূচির আওতায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কৃষিকাজে ব্যবহৃত পরিবেশ দূষণকারী জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর সেচযন্ত্রের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব সৌরচালিত সেচযন্ত্র স্থাপনের জন্য প্রান্তিক কৃষকরা এই সহজ শর্তের ঋণ সুবিধা পাবেন।
পাশাপাশি, একটি সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার অতি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ যেমন-বিদ্যুৎ রূপান্তরক যন্ত্র, আধুনিক বিদ্যুৎ পরিমাপক যন্ত্র এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে উন্নতমানের বিদ্যুৎ সংরক্ষক কোষ বা মজুত ব্যবস্থা ক্রয়ের ক্ষেত্রেও গ্রাহকরা এই ঋণের অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন।
সরকারের এই এক হাজার পাঁচশত কোটি টাকার বিশাল ঋণ কর্মসূচিটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়নের জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এই অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলো হলো-অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ অবকাঠামো অর্থায়ন তহবিল লিমিটেড এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন।
এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটিকে সমানভাবে পাঁচশত কোটি টাকা করে মোট এক হাজার পাঁচশত কোটি টাকার ঋণ তহবিল সরবরাহ করা হবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব দেশব্যাপী বিস্তৃত কর্মজালিক এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে বৃহৎ শিল্প পর্যায়ে এই ঋণের অর্থ অত্যন্ত সুচারুভাবে বিতরণ করবে বলে পরিপত্রে প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
এই বিশাল ঋণ কর্মসূচির অর্থের উৎস সম্পর্কেও সরকারের অর্থ বিভাগের নির্দেশিকায় অত্যন্ত সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে যে, আসন্ন অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৬-২০২৭ সালের জাতীয় বাজেটে ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের সার্বিক উন্নয়নের জন্য যে দুই হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, মূলত সেখান থেকেই পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এক হাজার কোটি টাকার সংস্থান করা হবে।
অপরদিকে, এই তহবিলের বাকি পাঁচশত কোটি টাকার যোগান দেওয়া হবে সরকারের নিজস্ব পরিচালন ঋণ তহবিল থেকে। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং উপর্যুক্ত তিনটি অংশগ্রহণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে এই অর্থ ছাড় করা হবে।
গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের সার্বিক সুবিধার কথা গভীরভাবে বিবেচনা করে এই বিশেষ ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ দশ বছর। এখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জনবান্ধব বিষয়টি হলো, এই দীর্ঘ মেয়াদের মধ্যে প্রথম এক বছরকে ঋণ পরিশোধের ছাড়ের সময়কাল হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে।
অর্থাৎ, ঋণ গ্রহণের পর প্রথম বারো মাস গ্রাহককে কোনো প্রকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। এই এক বছর সময়কালের মধ্যে গ্রাহক তার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সফলভাবে স্থাপন করে তা থেকে সরাসরি সুফল পেতে শুরু করবেন। ছাড়ের সময়কাল শেষ হওয়ার পর পূর্বনির্ধারিত কিস্তির মাধ্যমে আসল অর্থ ও সুদ পরিশোধের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
অংশগ্রহণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে সরাসরি তাদের নিজেদের মাধ্যমে অথবা তাদের অধীনস্থ কোনো স্বীকৃত সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকদের দোরগোড়ায় এই ঋণ পৌঁছে দিতে পারবে।
তবে এখানে একটি অত্যন্ত কঠোর শর্ত যুক্ত করা হয়েছে যে, কোনো গ্রাহক যদি সময়ের আবর্তে ঋণ পরিশোধে চরমভাবে ব্যর্থ হন বা ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হন, তবে সেই আর্থিক ক্ষতির সম্পূর্ণ ঝুঁকি সংশ্লিষ্ট ঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানকেই তাদের নিজস্ব দায়িত্বে বহন করতে হবে।
সরকারের মূল তহবিলের ওপর এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেওয়া হবে না। সরকারি তহবিলের যথাযথ ও সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই ঋণের অর্থ খরচের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
নির্দেশিকায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বিশেষ তহবিলের অর্থ কোনোভাবেই গ্রাহকের পুরোনো ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, পুরোনো ঋণ নবায়ন বা কৃত্রিমভাবে হিসাব সচল রাখার প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা যাবে না।
এছাড়া, এই অর্থ দিয়ে কোনো ধরনের স্থাবর সম্পত্তি বা জমি ক্রয়, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিলাসবহুল ভোগবিলাস, প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন প্রশাসনিক ব্যয় মেটানো কিংবা অন্য কোনো ব্যবসায়িক তহবিলে অর্থ স্থানান্তর করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।
ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আন্তর্জাতিক পেশাদারিত্ব বজায় রাখার জন্য অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে একটি সুনির্দিষ্ট ঋণ বিতরণ নীতি ও গ্রাহকের যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।
ঋণ প্রদানের আগে গ্রাহকের পরিচিতি নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে, দেশের প্রচলিত অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন মোকাবিলা সংক্রান্ত যাবতীয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
এই প্রক্রিয়ায় বিন্দুমাত্র অবহেলা বা শৈথিল্য প্রদর্শন করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ আর্থিক জবাবদিহিতা ও আধুনিক প্রযুক্তিগত নজরদারি নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি অংশগ্রহণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এই তহবিলের জন্য একটি সম্পূর্ণ পৃথক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করতে হবে।
এছাড়া, পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত একটি সুনির্দিষ্ট পরিচালন পরিকল্পনা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। আর্থিক লেনদেনে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিটি ঋণের জন্য একটি সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র শনাক্তকারী নম্বর ব্যবহার করতে হবে এবং প্রযুক্তিগত আর্থিক হিসাবের মাধ্যমেই কেবল অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মসূচির সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত নজরদারির জন্য প্রতি তিন মাস অন্তর ঋণ বিতরণ ও আদায়ের বিস্তারিত প্রতিবেদন অর্থ বিভাগে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সার্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা প্রমাণের জন্য প্রতি বছর এই ঋণ কর্মসূচির একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বহিঃনিরীক্ষা সম্পন্ন করে তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে দাখিল করতে হবে।
অর্থবছর শেষ হওয়ার সর্বোচ্চ নব্বই দিনের মধ্যে নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। নির্দেশিকাটি জারির পরবর্তী ত্রিশ দিনের মধ্যে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজস্ব ঋণনীতি এবং কর্মসূচির বিস্তারিত নির্দেশিকা অর্থ বিভাগে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনস্বার্থে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক মহান লক্ষ্যে জারি করা এই পরিপত্রটি প্রকাশের দিন থেকেই অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।