রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম

আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে
ছবি : Collected

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষিকার একমাত্র কিশোর সন্তানকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যার পেছনের মূল রহস্য অবশেষে উদ্ঘাটন করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একটি দামি মুঠোফোন বা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার হীন উদ্দেশ্যেই ১৩ বছর বয়সী নিষ্পাপ স্কুলছাত্র ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

একটি সাধারণ ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের জন্য এমন নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পুরো কুমিল্লা শহর, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারসহ দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য, গভীর শোক এবং তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত, পেশাদার ও কার্যকরী পদক্ষেপের ফলে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই এই চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

 

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া দুইটার দিকে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য, তদন্তের অগ্রগতি এবং আটকের বিষয়গুলো গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।

 

অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালিত পুলিশি তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গণমাধ্যমকর্মীদের জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্ত, পারিপার্শ্বিক প্রমাণ এবং আটকদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, নিহত কিশোরের কাছে থাকা দামি আইফোনটি আত্মসাৎ করাই ছিল ঘাতকদের একমাত্র লক্ষ্য।

 

এই একটিমাত্র আর্থিক লোভের বশবর্তী হয়েই অপরাধীরা সংঘবদ্ধভাবে একটি তরতাজা ও সম্ভাবনাময় প্রাণকে নিষ্ঠুরভাবে চিরতরে শেষ করে দিয়েছে। পুলিশের অত্যন্ত তৎপর ও সাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে চারজন সন্দেহভাজন তরুণকে আটক করা হয়েছে।

 

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আটককৃতদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়। আটককৃত এই চার তরুণ হলো তুহিন, ফাহাদ, কামরুল এবং সিয়াম। কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিশ্চিত করেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিবিড় ও কৌশলগত জিজ্ঞাসাবাদের মুখে আটককৃত এই চার তরুণই ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার দায় সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করে নিয়েছে।

 

তারা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছে কীভাবে একটি দামি মুঠোফোনের লোভে তারা পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই পৈশাচিক পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করেছিল এবং হত্যার পর প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করেছিল।

 

নিহত ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলের দিকে মায়ের একটি মূল্যবান আইফোন নিয়ে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়।

 

নিখোঁজের পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের অদূরে লালমাই পাহাড় ঘেঁষা সানন্দা গ্রামের একটি নির্জন ঝোপের ভেতর থেকে অপ্রতিমের নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মায়ের কোল আলো করে থাকা এই মেধাবী কিশোরের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে গোটা পরিবারে এখন শোকের মাতম চলছে।

 

যে বয়সে তার হেসেখেলে, নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করে দিন কাটানোর কথা ছিল, ঠিক সেই বয়সেই তাকে এমন ভয়ংকর নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হলো। এই অকাল ও নির্মম প্রয়াণে শুধু তার পরিবারই নয়, বরং তার সহপাঠী, শিক্ষক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মাঝেও এক গভীর শোক ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

 

অপ্রতিম হত্যার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার দাবিতে রবিবার সকাল থেকেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সন্তানের এমন নির্মম পরিণতি কোনো মা-বাবার পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

 

সমাজবিজ্ঞানী এবং সচেতন মহল মনে করছেন, নিছক একটি ব্যবহার্য বস্তু বা মুঠোফোন ছিনতাই করার জন্য একজন মানুষকে, বিশেষ করে একজন নিরীহ কিশোরকে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা আমাদের সমাজের চরম নৈতিক অবক্ষয় এবং মূল্যবোধের পতনের এক ভয়াবহ চিত্রই উন্মোচিত করে।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বর্তমানে এই স্পর্শকাতর মামলাটির পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রচলিত আইনি কাঠামোর সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন বদ্ধপরিকর।

 

অপরাধীদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করার বিন্দুমাত্র সাহস না পায়। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য এবং আইনি পদক্ষেপ পরবর্তীতে গণমাধ্যমকে জানানো হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।