শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায়ে এই লংমার্চ: শফিকুর রহমান

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম

১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায়ে এই লংমার্চ: শফিকুর রহমান
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের আপামর জনসাধারণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের ডাকা ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখী লংমার্চ গাইবান্ধায় এসে পৌঁছেছে।

 

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ী চৌমাথায় আয়োজিত এক বিশাল পথসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে যেমনটা দেখা যায়, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে, তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে এই শীর্ষ নেতার বক্তব্যে।

 

তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় স্পষ্ট করে দেন যে, তাদের এই বৃহত্তর আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নয়, বরং এটি সমগ্র দেশবাসীর অস্তিত্ব ও বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার আদায়ের একটি সম্মিলিত ও আপসহীন সংগ্রাম।

 

দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এবং সরকারের নানামুখী ব্যর্থতার কড়া সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান জানান, সরকার যদি জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সাম্প্রতিক গণভোটের রায়কে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করত, তবে আজ বিরোধী জোটকে পুনরায় রাজপথে নামতে হতো না।

 

তিনি দেশের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের চরম দুর্দশার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, ঐতিহাসিক জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হলে, দেশব্যাপী বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি চিরতরে বন্ধ হলে এবং সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এই লংমার্চের মতো বৃহত্তর কর্মসূচির কোনো প্রয়োজন ছিল না।

 

কৃষকদের ন্যায্য মূল্যে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়া এবং দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সীমাহীন সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকার জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলেই আজ দেশব্যাপী এই অভূতপূর্ব গণজাগরণের সৃষ্টি হয়েছে।

 

দেশের আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ও নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা সাম্প্রতিক একটি মর্মান্তিক ঘটনার প্রতি সমবেত জনতার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

 

কুমিল্লার এক কলেজ শিক্ষকের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া নিখোঁজ সন্তানের মৃতদেহ উদ্ধারের মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার উল্লেখ করে তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি প্রশাসন ও রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন তোলেন, এভাবেই কি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে দিনের পর দিন একের পর এক মায়ের বুক খালি হতে থাকবে?

 

বিবেকের তাড়নায় এবং দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের প্রতি চলমান চরম জুলুম ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই তারা আজ রাজপথে নেমেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তাই দিতে না পারে, তবে সেই রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্রের কোনো বৈধতা থাকে না এবং সাধারণ মানুষ নীরবে এই জুলুম আর সহ্য করবে না।

 

জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন নিয়ে সরকারকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের এই আট দফা দাবি যদি অবিলম্বে মেনে নেওয়া না হয়, তবে পরিস্থিতির প্রয়োজনে এই দাবি খুব শিগগিরই নয় দফা, দশ দফা এবং পরিশেষে এক দফা দাবিতে পরিণত হবে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এক দফা দাবি বলতে মূলত সরকার পতনের চূড়ান্ত ও সর্বাত্মক আন্দোলনের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। তিনি সরকারকে সময় দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, শাসকগোষ্ঠীর এখনো শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়া প্রয়োজন।

 

তাঁর ভাষ্যমতে, সমাজে যে অন্যায় করে এবং যে ব্যক্তি মুখ বুজে অন্যায় সহ্য করে, তারা উভয়েই সমান অপরাধী। তিনি উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করেন, দাবি আদায় না হলে ঢাকায় যে বৃহত্তর গণআন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে, তার জন্য তারা প্রস্তুত কি না।

 

তিনি সারা দেশের মুক্তিকামী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে ঢাকা অভিমুখে যাত্রার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে না ফেরার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। পলাশবাড়ীর এই গুরুত্বপূর্ণ পথসভায় ১১ দলীয় ঐক্যজোটের অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন।

 

তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সাবেক সহসভাপতি সাদিক কায়েম এবং সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেনসহ আরও অনেকে।

 

বিরোধী জোটের এই শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে সমাবেশটি এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। উল্লেখ্য, এর আগে শনিবার সকালেই রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে একটি বিশাল গাড়িবহর নিয়ে ঢাকা থেকে রংপুরের উদ্দেশ্যে এই দীর্ঘ লংমার্চের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

 

এই লংমার্চের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন, জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার, চলমান গ্যাস, বিদ্যুৎ ও তেলের তীব্র সংকট দূর করা, প্রশাসনের সব স্তরে দলীয়করণ, দখলদারিত্ব, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করা এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন।

 

ঢাকা থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ যাত্রায় গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস সড়কে প্রথম, টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ বাইপাস সড়কে দ্বিতীয়, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড়ে তৃতীয়, বগুড়ার মাটিডালি বিমান মোড়ে চতুর্থ এবং গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পঞ্চম পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সবশেষে শনিবার রাতে এশার নামাজের পর রংপুর জিলা স্কুল মাঠে একটি বিশাল সমাপনী সমাবেশের মাধ্যমে বিরোধী জোটের এই লংমার্চ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।