শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুবি শিক্ষকের নিখোঁজ সন্তানের রহস্যজনক মৃত্যু, ক্যাম্পাসের পাশের ঝোপ থেকে মরদেহ উদ্ধার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম

কুবি শিক্ষকের নিখোঁজ সন্তানের রহস্যজনক মৃত্যু, ক্যাম্পাসের পাশের ঝোপ থেকে মরদেহ উদ্ধার
ছবি : Collected

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় এক মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক ঘটনার সাক্ষী হলো স্থানীয় জনসাধারণ ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। নিখোঁজ হওয়ার মাত্র এক দিনের মাথায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী কিশোর সন্তানের নিথর দেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দক্ষিণ ফটক সংলগ্ন একটি নির্জন ঝোপের ভেতর থেকে ওই কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনায় নিহতের পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোক ও শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।

 

একটি সম্ভাবনাময় কিশোরের এমন অকাল ও রহস্যজনক মৃত্যু পুরো সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো সাধারণত এ ধরনের ঘটনাকে সামাজিক নিরাপত্তার একটি বড় মাপকাঠি হিসেবে দেখে থাকে, যা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

 

নিহত ওই কিশোরের নাম অপ্রতিম। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক ড. নাহিদা নাহিদের আদরের সন্তান ছিল। পড়াশোনা ও খেলাধুলায় মেতে থাকার বয়সে অপ্রতিমের এমন করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না কেউই। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত হয় গত শুক্রবার বিকেলে।

 

ওই দিন বিকেলে অপ্রতিম কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানাধীন ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকার নিজ বাসা থেকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বের হয়েছিল। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সে তার মায়ের ব্যবহৃত একটি মূল্যবান আইফোন সঙ্গে নিয়ে যায়।

 

পরিবারকে সে জানিয়েছিল যে, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশে ছবি তুলতে যাচ্ছে। কিন্তু সেই যাওয়াই যে তার জীবনের শেষ যাওয়া হবে, তা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি তার পরিবার।

 

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলেও অপ্রতিম যখন বাসায় ফিরে আসেনি, তখন পরিবারের সদস্যদের মনে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। সম্ভাব্য সব জায়গায়, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছে খবর নিয়েও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

 

দীর্ঘ সময় ধরে চারদিকে খোঁজাখুঁজি করার পরও আদরের সন্তানের কোনো হদিস না পেয়ে পরিবারটি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। একটি অনিশ্চিত ও আতঙ্কগ্রস্ত রাত পার করার পর অবশেষে শনিবার দুপুরে তাদের সব আশা নিরাশায় পরিণত হয়।

 

সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গোনা বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছানোর চেয়ে ভারী আর কিছুই হতে পারে না। শনিবার দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেট এলাকার কাছের একটি ঝোপঝাড়ের মধ্যে স্থানীয়রা একটি কিশোরের মরদেহ দেখতে পান।

 

মুহূর্তের মধ্যেই এই খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানে উৎসুক জনতার ভিড় জমতে শুরু করে। খবর পেয়ে কালবিলম্ব না করে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানা পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়।

 

পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পুরো ঘটনাস্থলটি ঘিরে ফেলে, যাতে কোনো ধরনের আলামত নষ্ট না হয়। এরপর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, উদ্ধারকৃত ওই মরদেহটি নিখোঁজ হওয়া ১৩ বছর বয়সী কিশোর অপ্রতিমের।

 

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে এই মর্মান্তিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং মরদেহটি উদ্ধার করে।

 

তবে এটি নিছক কোনো দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধ বা অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, তা এখনই শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের জন্য পুলিশ ইতোমধ্যেই একটি নিবিড় ও বহুমাত্রিক তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।

 

যেহেতু অপ্রতিম বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল, তাই তার সেই বন্ধুদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা তদন্তের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে বলে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

মায়ের যে আইফোনটি সে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল, সেটি উদ্ধার হয়েছে কি না, অথবা কোনো মূল্যবান বস্তু বা মোবাইল ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে কি না, এমন নানা দিক বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের তদন্তের জাল বিস্তার করছে।

 

পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মরদেহের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ও আইনানুগ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

 

এদিকে, ড. নাহিদা নাহিদের মতো একজন বিদ্যানুরাগী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকের সন্তানের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহকর্মীরা শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যদিও সন্তান হারানোর এই সীমাহীন শূন্যতা কোনো সান্ত্বনাতেই পূরণ হওয়ার নয়।

 

এমন একটি নিরাপদ বলে বিবেচিত আবাসিক ও ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর চিন্তার উদ্রেক করেছে।

 

সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত সম্পন্ন করে প্রকৃত সত্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন। দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা গেলে তা নিহত কিশোরের পরিবারের জন্য কিছুটা হলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে এবং সমাজের অন্য শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।