শুক্রবার, আঠারোই সেপ্টেম্বর সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার রতনপুর গ্রামে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত সীমাহীন দুর্নীতি, লুণ্ঠন এবং মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান সরকার দেশে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সম্পূর্ণরূপে বদ্ধপরিকর।
শুক্রবার সকালে মূলত একটি অত্যন্ত মহতী উদ্যোগের অংশ হিসেবে রতনপুর গ্রামে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। রাজধানী ঢাকার শাহবাগ এলাকায় বসবাসরত বয়োবৃদ্ধ ও সহায়সম্বলহীন নারী গোলাপী বেগমের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে একটি নতুন বাসগৃহ উপহার দেওয়া হয়।
সেই উপহারের ঘরের চাবি এবং জমির আনুষ্ঠানিক দলিল হস্তান্তর করার জন্যই এই আনন্দঘন ও বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই সরকারি উদ্যোগের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে মন্ত্রী দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের বিচার এবং বিগত সরকারের জবাবদিহির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে জনগণের সামনে তুলে ধরেন।
সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ও জনমনে একটি গুঞ্জন ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে যে, আগামী একত্রিশে ডিসেম্বরের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারেন। এই প্রসঙ্গের অবতারণা করে পর্যটনমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মূলত দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার হীন উদ্দেশ্যে ছড়ানো হচ্ছে।
বিগত সরকারের যেসব সুবিধাভোগী ও দোসররা এখনো দেশের ভেতরে ও বাইরে আত্মগোপনে আছেন, তাদের উজ্জীবিত করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এমন গুজব রটানো হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এই গুঞ্জনের কড়া জবাব দিয়ে রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ডিসেম্বরের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোনো যৌক্তিকতা বা প্রয়োজন নেই; তিনি যদি আগামীকালই দেশে ফিরে আসেন, তবে রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বরণ করে নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
তবে সেই অভ্যর্থনা হবে সম্পূর্ণ আইনি কাঠামোর মধ্যে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে, যেখানে অভিযুক্তের হাতে থাকবে হাতকড়া। বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলকে একটি নিষ্ঠুর স্বৈরতান্ত্রিক আমল হিসেবে আখ্যায়িত করে মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল।
দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সম্পদ লুণ্ঠন করে গুটিকয়েক ক্ষমতাধর মানুষ নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করেছে। তবে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, অবৈধভাবে উপার্জিত সেই বিপুল অর্থ ও সম্পদ তারা এখন শান্তিতে ভোগ করতে পারছে না।
জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে তাদের প্রত্যেককে দেশের প্রচলিত আইনের কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। মন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, বাংলাদেশে ফিরে এলেই এই সকল জঘন্য অপরাধের জন্য তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে এবং কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
দীর্ঘ সময় ধরে জনগণের ওপর বিগত সরকারের অবর্ণনীয় দমন-পীড়ন এবং অমানবিক আচরণের কথা উল্লেখ করে এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের ওপর যে নিষ্ঠুর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার সম্পূর্ণ ও নিরপেক্ষ বিচার এই স্বাধীন বাংলার মাটিতেই অনুষ্ঠিত হবে।
সমগ্র জাতি আজ এই ঐতিহাসিক বিচারের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এই যুগান্তকারী আইনি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার এরই মধ্যে প্রতিবেশী দেশের কাছে অত্যন্ত জোরালো ও আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে।
শেখ হাসিনাসহ বিগত সরকারের যেসব প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং সুবিধাভোগী দোসররা দেশত্যাগ করে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের অবিলম্বে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার জন্য জোর দাবি জানানো হয়েছে।
মন্ত্রী প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতিসত্বর তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে একটি উন্মুক্ত ও সুষ্ঠু বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে। বক্তব্যের একেবারে শেষ পর্যায়ে মন্ত্রী দেশের মানুষের লুণ্ঠিত গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের বিষয়ে বর্তমান সরকারের আপসহীন ও দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকরা যে নিদারুণ বঞ্চনা ও ভোটাধিকার হরণের শিকার হয়েছেন, তার একটি সম্মানজনক ও ন্যায়সংগত সমাধান নিশ্চিত করাই এখন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।
জনগণের লুণ্ঠিত অর্থের প্রতিটি পয়সার হিসাব আদায় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি মর্মান্তিক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে দেশে একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উপস্থিত জনতাকে গভীরভাবে আশ্বস্ত করেন।
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য খালেদ হোসেন মাহবুব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল মান্নান এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলামসহ স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।