দীর্ঘদিনের প্রচলিত আইনি বাধ্যবাধকতা এবং আর্থিক স্বচ্ছতার মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ঋণখেলাপির দায়ে সংগঠনটির বর্তমান সভাপতি মো. আলী আফজালের পদ আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য ঘোষণা করেছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো বা সিআইবির একটি সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে এই অত্যন্ত কঠোর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি বাণিজ্যিক সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারের এমন প্রত্যক্ষ প্রশাসনিক পদক্ষেপ দেশের করপোরেট সুশাসন, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ক্ষেত্রে একটি জোরালো ও ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আবাসন খাত বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতির অন্যতম প্রধান একটি চালিকাশক্তি। দেশের বিপুল জনসংখ্যার অন্যতম মৌলিক অধিকার বাসস্থানের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিশাল অঙ্কের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় জিডিপিতে এই খাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান অনস্বীকার্য।
রিহ্যাব দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই খাতের ব্যবসায়ী, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং উদ্যোক্তাদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে। আবাসন খাতের নীতিনির্ধারণ, গ্রাহকের অধিকার সংরক্ষণ এবং রিয়েল এস্টেট শিল্পের সুস্থ বিকাশে এই সংগঠনটির ভূমিকা অপরিসীম।
ঠিক এমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল খাতের শীর্ষ নেতার পদে আসীন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং আইনি বৈধতা থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অত্যন্ত সুরক্ষিত তথ্যভাণ্ডারে তাঁর ঋণখেলাপি হওয়ার অকাট্য তথ্য উঠে আসায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আইনি কাঠামো বজায় রাখার স্বার্থে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করেনি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং স্বাধীন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সব সময়ই প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও নেতৃত্বের সততার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়ে থাকেন, আর ঠিক সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপ সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।
গত সোমবার, অর্থাৎ ১৪ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন-দুই শাখা থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা চিঠি জারির মাধ্যমে এই চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কথা দেশবাসীকে জানানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসচিব চৌধুরী সামিয়া ইয়াসমীনের সই করা ওই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠিতে আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এবং বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। চিঠিতে সুনির্দিষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি প্রতিবেদন গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রিহ্যাব সভাপতি মো. আলী আফজাল একটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত হয়েছেন।
একজন ঋণখেলাপি ব্যক্তি কোনোভাবেই এমন একটি বৃহৎ ও জাতীয় পর্যায়ের বাণিজ্যিক সংগঠনের নেতৃত্বে বহাল থাকতে পারেন না, কারণ এটি সরাসরি নৈতিকতা ও প্রচলিত আইনের পরিপন্থি। ফলশ্রুতিতে, রাষ্ট্রের প্রচলিত ‘বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২’-এর ২৩(১)(খ) ধারার সুস্পষ্ট ও কঠোর বিধান প্রয়োগ করে তাঁর সভাপতির পদটি তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সরকারি নিয়মকানুনের প্রতি পূর্ণাঙ্গ শ্রদ্ধা রেখে এই অপসারণের সিদ্ধান্তের বিষয়টি কেবল একটি চিঠির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সকল নিয়ন্ত্রক দপ্তরে এর আনুষ্ঠানিক অনুলিপি প্রেরণ করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের এই আদেশের অনুলিপি রিহ্যাবের বর্তমান সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টকে পাঠিয়েছে, যাতে করে সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণ, দৈনন্দিন পরিচালনা ও সাধারণ কার্যক্রমে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত স্থবিরতা বা আইনি জটিলতা তৈরি না হয়।
একই সঙ্গে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের নিবন্ধক এবং দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসকের কার্যালয়েও এই চিঠির অনুলিপি ভবিষ্যৎ ব্যবস্থা গ্রহণ ও অবগতির জন্য পাঠানো হয়েছে।
এর মাধ্যমে সরকার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে যে, আইনি অপসারণ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, বাধাহীন এবং সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে অবগত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের আইনি বিধানের কঠোর প্রয়োগ দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়ী সমাজে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন করপোরেট সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাবে।
ঋণখেলাপি সংস্কৃতির কারণে দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত যখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এমন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অন্যান্য বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্যও একটি সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
আবাসন খাতের সাধারণ গ্রাহক এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অবিচল আস্থা ধরে রাখতে রিহ্যাবের মতো সংগঠনের নেতৃত্বের প্রতি মানুষের বিশ্বাস অটুট থাকা একান্ত প্রয়োজন। আইনি কাঠামোর সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সেই আস্থার জায়গাকে আরও মজবুত ও সুসংহত করার একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে। এ ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে আর্থিক শৃঙ্খলার বিষয়ে আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করবে।