মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ওবায়দুল কাদের ও আরাফাতসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:২৭ পিএম

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ওবায়দুল কাদের ও আরাফাতসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এবং বিচারিক অঙ্গনে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে, জুলাই মাসের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ দলটির শীর্ষস্থানীয় সাত নেতাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

 

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেল এই সুনির্দিষ্ট রায় ঘোষণা করেন। বিচারিক আদালতের তথ্য অনুযায়ী, রায় ঘোষণার সময় সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত এই সাতজন আসামিই পলাতক ছিলেন।

 

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য পাঁচজন আসামি হলেন- নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড ও আইনি পর্যালোচনার দৃষ্টিতে এই রায় বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি সুশৃঙ্খল বিচারিক প্যানেল মঙ্গলবার বেলা সোয়া বারোটার দিকে জনাকীর্ণ আদালতে এই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন।

 

এই প্যানেলের অপর দুই সম্মানীয় সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রাষ্ট্রপক্ষের আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রের বিস্তারিত তথ্য অনুসারে, গত জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশব্যাপী সংঘটিত ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনকে নির্মমভাবে দমন করার লক্ষ্যে এই আসামিরা সুপরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।

 

তারা সাধারণ মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে প্রতিহত করতে লাগাতার প্ররোচনামূলক এবং উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। পাশাপাশি, দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানোসহ একাধিক গোপন ও প্রকাশ্য বৈঠকে ভয়াবহ সহিংসতার রূপরেখা প্রণয়ন করেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

 

দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে কঠোর দমন-পীড়ন চালানো এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ ও নিয়ন্ত্রণে তারা সরাসরি ভূমিকা পালন করেন।

 

তাদের এহেন মানবতাবিরোধী ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের ফলশ্রুতিতে সমগ্র দেশজুড়ে ব্যাপক হত্যা, পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টা এবং নজিরবিহীন সহিংসতা সংঘটিত হয়, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে সর্বোচ্চ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।

 

মামলার বিচারিক ইতিহাস ও নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই বহুল আলোচিত মামলার আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত ২০২৫ সালের ১৮ জুন তারিখে। দীর্ঘ ও অত্যন্ত সতর্কতাপূর্ণ আইনি তদন্ত কার্যক্রম শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তারা একই বছরের ৭ ডিসেম্বর প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেন।

 

পরবর্তীতে, বিচারিক নথিপত্র অত্যন্ত সুচারুভাবে যাচাই-বাছাই করার পর ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ট্রাইব্যুনাল-২ ওই দিনই এই গুরুতর অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলোর সূচনা করেন।

 

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ধাপে ধাপে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং রাষ্ট্রীয় খরচে আত্মপক্ষ সমর্থনকারী আইনজীবী নিয়োগের মতো আবশ্যিক আইনি কাজগুলো সুচারুভাবে সম্পন্ন করা হয়।

 

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও প্রাথমিক শুনানি শেষে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি পলাতক এই সাত আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিচারকাজের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন এবং প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল বিচারিক কার্যক্রম।

 

তদন্ত কর্মকর্তাসহ সর্বমোট ২৯ জন সাক্ষী এই মামলায় আদালতে উপস্থিত হয়ে এবং নথির মাধ্যমে তাদের জবানবন্দি ও সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। সাক্ষ্যগ্রহণের এই পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন একটি অকাট্য প্রমাণ হিসেবে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পূর্বে দেওয়া জবানবন্দিও আদালতে উপস্থাপন করা হয়, যা মামলার রায়ে অত্যন্ত গভীর প্রভাব ফেলেছে বলে আইনজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।

 

বিচারিক ক্যালেন্ডারের সময়সূচি অনুযায়ী, সকল সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া চলতি বছরের ২ আগস্ট সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এরপর ৪ আগস্ট থেকে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করে। টানা নয়টি কার্যদিবস ধরে রাষ্ট্রপক্ষ এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আত্মপক্ষ সমর্থনকারী আইনজীবীদের মধ্যে আইনি যুক্তিতর্ক চলার পর ১৭ আগস্ট এই ধাপের সমাপ্তি ঘটে।

 

বিচারিক প্যানেল ওই দিনই মামলাটিকে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন এবং চূড়ান্ত রায় ঘোষণার জন্য ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারণ করেন। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানিয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার জন্য আদালতে সর্বমোট ১২৩ সিরিজের বিপুল ও প্রামাণ্য নথিপত্র প্রদর্শন করা হয়েছে, যা এই ঐতিহাসিক রায়ের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।