রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জানাল মন্ত্রণালয়

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:১৫ পিএম

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অংশ নিতে আগ্রহী প্রার্থীদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে সরকার। রোববার রাজধানী ঢাকার সচিবালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গণমাধ্যমের কাছে এই বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন।

 

এদিন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এবং প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের এক আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। ওই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রার্থীদের আইনি যোগ্যতা এবং চলমান নানা জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন।

 

তিনি জানান, শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো শর্ত না থাকলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা এই নির্বাচনে আইনিভাবে প্রার্থী হতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্পূর্ণ এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের হাতে ন্যস্ত রয়েছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল।

 

এই সমস্ত বিভ্রান্তির সরাসরি জবাব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামো পরিচালনার জন্য যে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট আইনি বিধিমালা রয়েছে, তার কোনোটিতেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার ন্যূনতম কোনো শর্ত বা বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি।

 

তিনি আগামী দিনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের এ ধরনের অমূলক গুজবে কান না দেওয়ার এবং বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য জোরালো আহ্বান জানান। মীর শাহে আলম অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন যে, তৃণমূলে ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে শুরু করে ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কিংবা ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর এবং সর্বোচ্চ স্তরে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর-এই সকল জনপ্রতিনিধিত্বমূলক পদের কোনোটিতেই নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো আইনি প্রয়োজন নেই।

 

সংবাদ ব্রিফিংয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং আইনি জটিলতা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বিদ্যমান আইনি কাঠামোর পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

 

তিনি জানান, প্রচলিত স্থানীয় সরকার আইনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি প্রজাতন্ত্র, পরিষদ বা অন্য কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অধীন কোনো লাভজনক সার্বজনীন পদে অধিষ্ঠিত থাকেন, তবে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বলে আইনত বিবেচিত হবেন।

 

এই আইনি বিষয়টিকে আরও সুনির্দিষ্ট করতে গিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রণীত 'বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কুল-কলেজ, জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২৫'-এর বিধি ১১-এর ১৭(খ) ধারার প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি।

 

ওই নীতিমালায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী একই সময়ে একাধিক কোনো লাভজনক পদে, চাকরিতে বা আর্থিক সুবিধাযুক্ত কোনো পেশায় নিয়োজিত থাকতে পারবেন না।

 

সেখানে আর্থিক লাভজনক পদ বলতে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো ধরনের নিয়মিত বেতন, ভাতা, সম্মানি এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সুবিধাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই দুই ভিন্ন নীতিমালার আলোকে সৃষ্ট আইনি পরিস্থিতির সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের যেকোনো নির্বাচনের সামগ্রিক বিধিমালা এবং প্রার্থীদের আইনি যোগ্যতা বা অযোগ্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করার একমাত্র সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।

 

নির্বাচন কমিশন এখন বিদ্যমান স্থানীয় সরকার আইন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের হালনাগাদ নীতিমালাকে পর্যালোচনা করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতার বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে।

 

এরপরও যদি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে আরও কোনো বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় বা তারা আইনি মতামতের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করে, তবে আইন মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে গভীরভাবে আলোচনা করে বিষয়টির চূড়ান্ত ও স্বচ্ছ সমাধান দেওয়া হবে।

 

জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ না করার পেছনের গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক ও যৌক্তিক ভিত্তিগুলোও অত্যন্ত সাবলীলভাবে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

 

তিনি দেশের সর্বোচ্চ আইনসভার উদাহরণ টেনে বলেন, খোদ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রেই সংবিধানে বা প্রচলিত আইনে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।

 

জাতীয় পর্যায়ে আইনপ্রণেতাদের ক্ষেত্রেই যখন এমন কোনো শর্ত নেই, তখন স্থানীয় সরকার আইনের ক্ষেত্রেও সেটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। প্রতিমন্ত্রী এটিকে মানবাধিকার এবং সর্বজনীন ভোটাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেন।

 

তার মতে, তৃণমূল পর্যায়ে একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক হয়তো কোনো কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পাননি, কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ স্বশিক্ষিত এবং প্রজ্ঞাবান হতে পারেন। সমাজের মানুষের সেবা করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সনদের চেয়ে মানবিকতা, সততা এবং স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকার ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিটি নাগরিকের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার স্বতঃস্ফূর্ত অধিকারকে সম্মান জানিয়েই স্থানীয় সরকারের এই পাঁচটি আইনে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো কৃত্রিম বাধা রাখা হয়নি।