গত বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটায় শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিলটি নিয়ে বিরোধীদের উত্থাপিত বিভিন্ন আপত্তির বস্তুনিষ্ঠ জবাব দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রধান অঙ্গীকার এবং বর্তমান সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী র্যাবকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে।
নতুন বাহিনীটি আধুনিক যুগের আইনি চাহিদা ও রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থেই সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে গঠন করা হচ্ছে। সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দলীয় সদস্যদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, র্যাবের সমস্ত সম্পদ ও সরঞ্জাম নতুন বাহিনীতে স্থানান্তরের মাধ্যমে মূলত পুরোনো বাহিনীকেই নতুন নামে টিকিয়ে রাখার অপচেষ্টা করা হচ্ছে।
এই গুরুতর অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ও সুষ্ঠু ব্যবহারের বিষয়টি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি সংসদকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, একটি বাহিনী বিলুপ্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাদের ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, আধুনিক গোয়েন্দা সরঞ্জাম এবং অন্যান্য বহুমূল্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হবে বা ফেলে দেওয়া হবে।
জাতীয় অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে এবং নতুন করে কেনাকাটার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের বিপুল অপচয় রোধ করতেই এই সম্পদগুলো নতুন গঠিত এসআরবির কাছে আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ একটি প্রশাসনিক ও যৌক্তিক প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে পুরোনো বাহিনীর কাঠামোগত কোনো ধারাবাহিকতা নেই।
বিলের ওপর পর্যাপ্ত আলোচনা বা জনমত যাচাই করা হয়নি বলে বিরোধী দলীয় সদস্যরা যে ভিন্নমত বা আপত্তিপত্র জমা দিয়েছিলেন, সেটিও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নাকচ করে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সংসদকে অবহিত করেন যে, বিলটি চূড়ান্তভাবে পাসের আগে যথেষ্ট সময় নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
মন্ত্রিসভায় বিবেচনার জন্য উপস্থাপনের আগে দীর্ঘ সময় ধরে এটি মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা স্বাধীনভাবে তাদের মতামত দিতে পারেন।
পরবর্তীতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও এটি নিয়ে কয়েক কার্যদিবস ধরে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং বিরোধীদের বেশ কিছু যৌক্তিক প্রস্তাব ও সংশোধনী গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি উল্টো সতর্ক করে বলেন, এই বিল পাসে যত বেশি কালক্ষেপণ করা হবে, আইনিভাবে র্যাবের অস্তিত্ব তত বেশি দীর্ঘায়িত হবে, যা বিরোধী দলসহ দেশের কোনো নাগরিকেরই কাম্য নয়।
নতুন বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার বা কোনো অভিযোগ উঠলে তার বিচারপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে, সে বিষয়েও বিরোধী সদস্যদের গভীর উদ্বেগের সুস্পষ্ট জবাব দেন মন্ত্রী। তিনি পরিষ্কারভাবে জানান, প্রণীত আইনের চব্বিশ নম্বর ধারায় যে ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাভঙ্গ বা সাধারণ কোনো অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য তৈরি করা হয়েছে।
এটি সম্পূর্ণ একটি বিভাগীয় বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা। তবে কোনো সদস্য যদি গুরুতর কোনো ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তবে তার বিচার এই অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কমিটির মাধ্যমে হবে না। আইনের একুশ নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রচলিত ফৌজদারি আইন মেনেই দেশের সাধারণ অপরাধীর মতো অভিযুক্ত সদস্যের বিচার সম্পন্ন করা হবে।
আইনের সতেরো নম্বর ধারার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনকালে নেশাগ্রস্ত থাকা, সহকর্মীকে আঘাত করা, টহল ডিউটিতে অবহেলা করা বা বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকার মতো বিষয়গুলো বিভাগীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু এর বাইরের যেকোনো ফৌজদারি অপরাধের জন্য দেশের প্রচলিত আইনেই কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
এছাড়া, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অতীত অভিযোগগুলোর প্রেক্ষাপটে নতুন বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া নিয়েও স্বচ্ছতার বিষয়টি আইনে কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে জানান, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলে বা কোনো আলামত জব্দ করা হলে তা নিজেদের হেফাজতে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার কোনো আইনি সুযোগ এসআরবির নেই।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি ও জব্দকৃত সমস্ত আলামত নিকটবর্তী থানা কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করতে হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
সবশেষে আইনি কাঠামোর ঐতিহাসিক দুর্বলতা দূর করার বিষয়েও মন্ত্রী বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৩ বা ২০০৪ সালে র্যাব গঠন করা হয়েছিল মূলত ১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশের একটি দুর্বল ধারার অধীনে, যা আইনিভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না।
সেই ঐতিহাসিক আইনি ত্রুটি দূর করতে পুরোনো ইংরেজি আইনটি বাংলায় অনুবাদ করে যুগোপযোগী করা হয়েছে এবং সেখান থেকে র্যাবের অস্তিত্ব চিরতরে আইনিভাবে মুছে ফেলা হয়েছে।
একই সঙ্গে, আধুনিক সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া সাইবার অপরাধ দমনে সরকার পুলিশ বাহিনীর অধীনে সম্পূর্ণ নতুন একটি ‘সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও তিনি সংসদকে অবহিত করেন।