বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিহত যুবকের শেষকৃত্য ঘিরে আইনি জটিলতা, মায়ের দাবি দাফন, বাবার চাওয়া দাহ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৫৯ পিএম

নিহত যুবকের শেষকৃত্য ঘিরে আইনি জটিলতা, মায়ের দাবি দাফন, বাবার চাওয়া দাহ
ছবি : Collected

যেকোনো মানুষের মৃত্যুর পর তার স্বজনদের প্রধান কর্তব্য হলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্মানজনকভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত এক যুবকের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতি।

 

নিহত যুবকের নাম শুভ, যিনি ধর্মান্তরিত হওয়ার পর বিল্লাল নাম ধারণ করেছিলেন বলে তার মায়ের দাবি। হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও তার মৃতদেহ সৎকার করা সম্ভব হয়নি। এর নেপথ্যে রয়েছে তার পিতা ও মাতার ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় অবস্থান।

 

মা আয়েশা বেগম চাইছেন তার ছেলেকে ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক দাফন করতে। অন্যদিকে, জন্মসূত্রে সনাতন ধর্মের অনুসারী হওয়ায় বাবা হরি চন্দ্র দাসের দৃঢ় দাবি, হিন্দু শাস্ত্রীয় রীতি মেনেই ছেলের মৃতদেহ চিতায় দাহ করতে হবে। এমন এক স্পর্শকাতর ধর্মীয় ও পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি গড়িয়েছে আদালতের আঙিনায়।

 

পারিবারিক এই জটিলতার শেকড় প্রোথিত রয়েছে প্রায় দুই দশক আগের এক বিচ্ছেদের ঘটনায়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২০০৩ সালে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাস এবং মা আয়েশা বেগমের মধ্যে আইনগতভাবে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।

 

মায়ের পরিবারের দাবি অনুযায়ী, বিচ্ছেদের পর শুভ, তার মা এবং ভাই-বোনেরা স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। শুভর ভাই ইব্রাহিম জানান, তারা দুই ভাই একসঙ্গে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর সুন্নতে খাৎনা সম্পন্ন করেন। শুধু তাই নয়, নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় অবস্থিত রওজাতুস সালেহীন মাদরাসায় তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও গ্রহণ করেছিলেন।

 

তদন্তকারী কর্মকর্তার তথ্যমতে, শুভ আইনি হলফনামার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মান্তরিত হয়ে বিল্লাল নাম গ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে ইসলামি শরিয়ত মেনে কাবিননামার মাধ্যমে জ্যুথি নামের এক মুসলিম নারীকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির সংসারে একটি সন্তানও রয়েছে।

 

এতসব প্রমাণের পরও বাবা হরি চন্দ্র দাস নিজের অবস্থানে অনড়। তিনি মনে করেন, যেহেতু ছেলের জন্ম একটি হিন্দু পরিবারে, তাই হিন্দু রীতিনীতি অনুসারেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়া উচিত। পারিবারিক এই সংকটের কারণে প্রশাসনকে চরম বিপাকে পড়তে হয়েছে।

 

নারায়ণগঞ্জের সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, নিহতের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাবা ও মায়ের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় পুলিশ কোনো একক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রথমে মৃতদেহটি সদর মডেল থানার একটি মরদেহবাহী হিমায়িত যানে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।

 

তবে দীর্ঘসূত্রতার আশঙ্কা থেকে পরবর্তীতে তা রাজধানী ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে স্থানান্তর করা হয়। বৃহস্পতিবার এই স্পর্শকাতর বিষয়টির ওপর আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

 

বিজ্ঞ বিচারকের চূড়ান্ত নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করেই প্রশাসন পরবর্তী আইনি ও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আদালত দাফন বা দাহ-যেই সিদ্ধান্তই প্রদান করবেন, পুলিশ সেই মোতাবেক পরিবারের কাছে মৃতদেহ হস্তান্তর করবে।

 

শেষকৃত্য নিয়ে এই জটিলতার আড়ালে চাপা পড়ে থাকা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিও অত্যন্ত নৃশংস। গত ৫ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে, আনুমানিক সোয়া একটার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়া এলাকার হকার্স মার্কেটের পেছনে দুর্গামল সংলগ্ন সড়কে শুভকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

 

পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গুলিবিদ্ধ ও উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় তার মৃতদেহ উদ্ধার করে। অন্ধকার জগতের এক ভয়ংকর চিত্র ফুটে ওঠে যখন পুলিশ নিহতের মরদেহের পাশ থেকে একশটি ইয়াবা বড়ি এবং পাঁচটি গুলির খোসা উদ্ধার করে। এই হত্যাকাণ্ডটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

 

হত্যাকাণ্ডের পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি চৌকস দল তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন সুমন, সিজান এবং সোহান।

 

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে হত্যাকাণ্ডের পেছনের এক রোমহর্ষক ছক। ধারণা করা হচ্ছে, মাদক কারবারের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, মাত্র দশটি ইয়াবা বড়ি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শুভরই এক পূর্বপরিচিত সহযোগীর মাধ্যমে তাকে ওই নির্জন ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়েছিল।

 

সেখানে আগে থেকেই দশ থেকে বারো জনের একটি সশস্ত্র দল ওত পেতে ছিল। শুভ ঘটনাস্থলে পৌঁছামাত্রই তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে এই নৃশংস হামলা চালানো হয়। বর্তমানে পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রেখেছে।