তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেশবাসীকে এই প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন যে, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বেআইনি, অযৌক্তিক বা এখতিয়ারবহির্ভূত নির্দেশনা প্রদান করা হবে না।
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক বিশেষ ও যুগান্তকারী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।
‘নির্বাচনী দায়িত্ব পেশাদারিত্বের সাথে সম্পাদনের লক্ষ্যে পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচনকালীন সময়ে মাঠপর্যায়ে পুলিশের শতভাগ পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও আইনি ভূমিকা সুনিশ্চিত করা।
দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রক্রিয়ায় পুলিশ বাহিনীর অপরিহার্য ভূমিকার ওপর গভীরভাবে আলোকপাত করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান, একটি সর্বজনগ্রাহ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের যেমন সুস্পষ্ট সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রের প্রধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশেরও সুনির্দিষ্ট আইনি ও সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে।
এই দুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত, স্বচ্ছ ও সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই কেবল দেশের আপামর জনগণের ভোটাধিকার স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দেশজুড়ে সফলভাবে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন করার জন্য তিনি পুলিশ প্রশাসনের সর্বাত্মক ও আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি তার প্রশাসনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণ অবিচল। নির্বাচন কমিশন কেবল তার নিজস্ব আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকেই স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো অযাচিত হস্তক্ষেপ বা বেআইনি চাপ প্রয়োগ করবে না।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন আদৌ সম্ভব কি না, এমন প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক মনোভাব পোষণ করেন।
তিনি অতীতের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের সময় দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়ে কোনো অংশেই খারাপ নয়।
বরং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান সক্ষমতা, কৌশলগত দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ওপর বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ ও অবিচল আস্থা রয়েছে।
যদিও বর্তমানে একটি দলীয় সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছে, তবুও একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন নিজেদের ম্যান্ডেট অনুযায়ী কাজ করতে বদ্ধপরিকর। পুলিশ প্রশাসনও তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে পালন করবে বলে তিনি দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন।
সিইসি জোর দিয়ে বলেন, পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও ইতিমধ্যে কমিশনকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তারা একটি সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচন দেশবাসীকে উপহার দেওয়ার লক্ষ্যে পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ মাপকাঠি বজায় রেখে মাঠে কাজ করবেন।
একই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হাসান ফকির নির্বাচনকালীন সময়ে পুলিশের সামগ্রিক ভূমিকা ও পেশাগত দায়িত্ববোধ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
দলীয় সরকারের অধীনে পুলিশ প্রশাসন কতটা চাপমুক্ত ও স্বাধীনভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারবে, এমন এক জটিল প্রশ্নের জবাবে তিনি অত্যন্ত সাবলীল ও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমান সরকার রাজনৈতিক পটভূমির ও দলীয় হলেও এটি একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক সরকার।
তাই গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি ও দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা সমুন্নত রাখতে পুলিশ বাহিনী সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশের প্রতিটি প্রান্তে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, সংঘাতহীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে যত ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, নির্বাচন কমিশনের সার্বিক পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী তার শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন। গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে নানা প্রেক্ষাপটের পর পুলিশ বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি ও জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের বিষয়েও আইজিপি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গণমাধ্যমের সামনে কথা বলেন।
বিগত ছয় মাসে পুলিশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংস্কার ও সাধারণ মানুষের কাছে ভাবমূর্তি ফেরানোর উদ্যোগে বাহিনীর সাফল্য কতটুকু-এমন এক সরাসরি প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন যে, এই স্বল্প সময়ের মধ্যে পুলিশ বাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে তাদের সাফল্য শতভাগ।
তিনি মনে করেন, জনগণের আস্থাশীল, নির্ভরযোগ্য ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ নিজেদের পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে পুরোপুরি সক্ষম হয়েছে। পুলিশের এই নতুন রূপ ও পেশাদারিত্ব আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে সাধারণ ও প্রান্তিক পর্যায়ের ভোটারদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দেশজুড়ে একটি ভীতিহীন, উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে অত্যন্ত কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করবে।
নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের এই ইতিবাচক, সমন্বিত ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে বলে রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা জোরালো মত প্রকাশ করেছেন।