মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ, নেপথ্যের ঘটনা জানালেন অ্যাটর্নি জেনারেল

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৪৯ পিএম

আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ, নেপথ্যের ঘটনা জানালেন অ্যাটর্নি জেনারেল
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ স্তর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে একটি নজিরবিহীন ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। তথ্য গোপন এবং আদালতের সঙ্গে প্রতারণার দায়ে এক আইনজীবীকে জরিমানার নির্দেশ দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সৃষ্টি হয়।

 

একপর্যায়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিরা বিচারকার্য স্থগিত রেখে এজলাস ছেড়ে নেমে যান। মঙ্গলবার দুপুরে ঘটা এই অভাবনীয় ঘটনার পর আইনাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

 

পরবর্তীতে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হয়ে এই ঘটনার বিস্তারিত প্রেক্ষাপট ও আইনি দিকগুলো অত্যন্ত পেশাদারত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

 

অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের জানান, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত মূলত ২০১৩ সালের একটি কাজী নিয়োগ সংক্রান্ত মামলা থেকে। ওই নির্দিষ্ট মামলার বাদী একই আদেশের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে ধারাবাহিকভাবে পাঁচটি পৃথক রিট আবেদন দায়ের করেন।

 

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের প্রচলিত রীতিনীতি ও আইনি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো কারণে যদি পূর্বে কোনো মামলা দায়ের করা হয় এবং সেটি আদালত কর্তৃক খারিজ হয়ে যায়, তবে পরবর্তী সময়ে নতুন করে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে অবশ্যই পূর্বের মামলার বিষয়বস্তু ও খারিজ হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

 

একই সঙ্গে নতুন করে মামলা করার মতো যৌক্তিক ও বৈধ কারণ আদালতে উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু এই নির্দিষ্ট মামলায় ওই নারী আইনজীবী এবং মামলার মূল আবেদনকারী চরমভাবে তথ্য গোপন করেছেন।

 

তিনি পাঁচটি রিট আবেদন করলেও পূর্বের খারিজ হওয়া আদেশের কথা পরবর্তী আবেদনগুলোতে সম্পূর্ণভাবে আড়াল করে যান, যা সর্বোচ্চ আদালতের দৃষ্টিতে এক ধরনের গুরুতর আইনি প্রতারণা।

 

এই আইনি প্রতারণা ও তথ্য গোপনের বিষয়টি আপিল বিভাগের নজরে এলে আদালত অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। মঙ্গলবার সকালে বিচারিক কার্যক্রমের শুরুতেই প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সংশ্লিষ্ট নারী আইনজীবী এবং মামলার মূল আবেদনকারী প্রত্যেককে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট দশ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দেন।

 

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, জরিমানার এই সম্পূর্ণ অর্থ জনকল্যাণমূলক কাজের অংশ হিসেবে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়। অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই মামলাগুলোতে সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।

 

সকালে নয়টা থেকে সোয়া নয়টার দিকে যখন জরিমানার আদেশটি প্রদান করা হয়, তখন অ্যাটর্নি জেনারেল নিজে আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং জরিমানার শিকার হওয়া নারী আইনজীবী ঠিক তার পাশেই বসা ছিলেন। সে সময় ব্যারিস্টার খোকন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

 

নারী আইনজীবী তখন অত্যন্ত বিচলিত হয়ে বারবার বলছিলেন যে তার সিনিয়র আইনজীবী তাকে ভয়ানক বিপদে ফেলেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল আরও জানান, ওই নারী আইনজীবী ও তার স্বামী উভয়েই আপিল বিভাগের নিয়মিত আইনজীবী হিসেবে পরিচিত।

 

আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলতে থাকার একপর্যায়ে দুপুর বারোটা পঁয়ত্রিশ মিনিটের দিকে এই ঘটনার নতুন মোড় নেয়। ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন আদালতে উপস্থিত হয়ে ওই জরিমানার আদেশের প্রসঙ্গটি পুনরায় উত্থাপন করেন।

 

তিনি একজন আইনজীবীকে এত বড় অঙ্কের জরিমানা করার বিষয়টি নিয়ে আদালতের কাছে আপত্তি জানান। তখন প্রধান বিচারপতি তাকে অত্যন্ত শান্তভাবে বুঝিয়ে বলেন যে, আদালত সমস্ত নথিপত্র এবং তথ্য-প্রমাণ গভীরভাবে পর্যালোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং তাদের দেওয়া আদেশটি কোনোভাবেই পরিবর্তন করা হবে না।

 

প্রধান বিচারপতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এখানে আদালতের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুতর প্রতারণা করা হয়েছে এবং আপিল বিভাগের পূর্ববর্তী আদেশ নিয়েও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্যমতে, আদালতের এমন অনড় অবস্থানের পর অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন একটি অনভিপ্রেত মন্তব্য করে বসেন।

 

তিনি প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আইনজীবীদের আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। প্রথমদিকে প্রধান বিচারপতি বিষয়টি অত্যন্ত সহজভাবে গ্রহণ করেন এবং তাকে প্রশ্ন করেন যে তিনি আসলেই এই কথাটি বোঝাতে চেয়েছেন কি না।

 

কিন্তু ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন যখন পুনরায় প্রায় একই ধরনের কথার পুনরাবৃত্তি করার চেষ্টা করেন, তখন পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। প্রধান বিচারপতি তখন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন যে, তিনি যে মন্তব্যটি করেছেন তা সম্পূর্ণভাবে আদালত অবমাননার শামিল।

 

এমন একটি গুরুতর ও অপ্রত্যাশিত মন্তব্য শোনার পর প্রধান বিচারপতি ঘোষণা করেন যে, তিনি ওই দিনের জন্য আর কোনো বিচারিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবেন না। এই কথা বলার পরপরই তিনি এবং তার সঙ্গে থাকা অন্যান্য বিচারপতিরা এজলাস ছেড়ে চলে যান।

 

ঘটনার সামগ্রিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল অত্যন্ত পেশাদারত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে বলেন, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট সকল আইনজীবীর জন্য এক পবিত্র কর্মস্থল এবং প্রধান বিচারপতি হলেন এই পবিত্র আঙিনার সর্বোচ্চ অভিভাবক।

 

আইনি পেশা পরিচালনা করতে গিয়ে কখনো কখনো আইনজীবীদের সঙ্গে আদালতের ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে এবং আদালত শাসনও করতে পারেন। কিন্তু পেশাদারিত্বের আসল সৌন্দর্য হলো, এই শাসন বা মতবিরোধ কেবল ওই নির্দিষ্ট মামলা বা বিচারকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকে।

 

রাষ্ট্রের প্রতি, সমাজের প্রতি এবং সর্বোপরি বিচারপ্রার্থী জনগণের প্রতি আইনজীবীদের যে মহান দায়িত্ব রয়েছে, তা সর্বাগ্রে মনে রাখার এবং বিচারালয়ের মর্যাদা সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান রাষ্ট্রের এই শীর্ষ আইন কর্মকর্তা।