রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা ৫৮ মিনিটে একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে করে তিনি রাজধানী ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়াম মাঠে অবতরণ করেন। এ সময় তাঁকে এক উষ্ণ, বর্ণিল ও অত্যন্ত আবেগঘন অভ্যর্থনা জানানো হয়।
রাষ্ট্রপ্রধানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রফিকুল হক, পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেনসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং নাগরিক সংবর্ধনা আয়োজক কমিটির বিশিষ্ট সদস্যবৃন্দ।
প্রিয় সন্তানকে রাষ্ট্রপতির মর্যাদায় কাছে পেয়ে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ, আনন্দ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। স্টেডিয়ামে অবতরণের পরপরই রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দুপুর ১২টা ৫৮ মিনিটে ঠাকুরগাঁও সার্কিট হাউসে উপস্থিত হন। সেখানে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
এই আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি তাঁর সফরের অত্যন্ত আবেগঘন ও ব্যক্তিগত একটি পর্বে অংশ নেন। জন্মভূমির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ ও পারিবারিক শিকড়ের টানে তিনি পৌর শহরের সেনুয়া গোরস্থানে ছুটে যান। সেখানে তিনি তাঁর প্রয়াত পিতা-মাতার কবর জিয়ারত করেন এবং তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন।
এরপর দুপুর ১টার দিকে তিনি শহরের কালিবাড়ি এলাকায় অবস্থিত তাঁর পৈতৃক বাসভবনে গমন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িতে তিনি দুপুরের আহার গ্রহণ ও বিশ্রাম সম্পন্ন করবেন।
বিশ্রাম শেষে রোববার বিকেল ৩টার দিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে স্থানীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাঁর যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। জেলার সর্বস্তরের জনগণ তাদের এই কৃতী সন্তানকে বরণ করে নেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তিনি পুনরায় নিজ বাসভবনে ফিরে যাবেন। সেখানে তিনি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক সহকর্মী, আত্মীয়স্বজন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হবেন।
সফরের প্রথম দিনের সব কর্মসূচি শেষে রাষ্ট্রপতি তাঁর নিজ বাসভবনেই রাত্রিযাপন করবেন বলে বঙ্গভবনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। সফরের দ্বিতীয় ও শেষ দিন সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টা থেকে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পুনরায় স্থানীয় জনসাধারণ, আত্মীয়স্বজন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
এরপর তিনি জেলার শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে সদর উপজেলার জামালপুর এলাকায় প্রস্তাবিত ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়’-এর আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলে উত্তরবঙ্গের এই অবহেলিত অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার প্রসারে তা এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে বলে শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে দুপুর দেড়টার দিকে তিনি নিজ বাসভবনে ফিরে দুপুরের খাবার গ্রহণ করবেন ও কিছু সময় বিশ্রাম নেবেন।
সফরের চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি সার্কিট হাউসে গিয়ে বিদায়ী গার্ড অব অনার গ্রহণ করবেন। এরপর দুপুর ২টার দিকে ঠাকুরগাঁও স্টেডিয়ামের হেলিপ্যাডে উপস্থিত হয়ে তিনি একটি বিশেষ হেলিকপ্টারযোগে পুনরায় রাজধানীর বঙ্গভবনের উদ্দেশে যাত্রা করবেন।
দেশের রাষ্ট্রপতির এই সফরকে কেন্দ্র করে সমগ্র ঠাকুরগাঁও জেলায় এক নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
রাষ্ট্রপতির আগমনস্থল মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়াম, সার্কিট হাউস, সেনুয়া কবরস্থান, কালিবাড়ির নিজ বাসভবন এবং নাগরিক সংবর্ধনাস্থলসহ শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ও এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রপতির এই ঐতিহাসিক সফর সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।
উল্লেখ্য, গত ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।
ওই নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) অলি আহমদ, যাঁকে তিনি বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেন।
দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়ার পূর্বে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আইনি ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণের লক্ষ্যে তিনি তাঁর নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য পদ, বিএনপির মহাসচিব পদ এবং সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। তাঁর এই বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।