শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় ভারত সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: ভারতীয় হাইকমিশনার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম

পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় ভারত সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: ভারতীয় হাইকমিশনার
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ়, টেকসই ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে উভয় দেশের জনগণের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুব শিগগিরই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত সফর করবেন বলে গভীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।

 

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে এরই মধ্যে উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অত্যন্ত ইতিবাচক, নিবিড় ও ফলপ্রসূ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে ভারতীয় দূতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সৌজন্যমূলক বৈঠকের পর উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহযোগিতার ভিত্তিতে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক ও মজবুত রূপ দেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন ভারতীয় হাইকমিশনার। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সুস্পষ্টভাবে জানান, কেবল আনুষ্ঠানিক সরকারি পর্যায়ে নয়, বরং দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যকার মেলবন্ধন ও আত্মিক সম্পর্ককে আরও নিবিড় ও শক্তিশালী করতে সব স্তরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রাখা হবে।

 

এদিনের বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে দুই দেশের সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা বা সংসদ কীভাবে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটাতে পারে এবং দুই দেশের আইনসভা কীভাবে যৌথভাবে কাজ করে সেই অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে, তা নিয়ে উভয়ের মধ্যে বিস্তারিত ও গঠনমূলক আলোকপাত করা হয়।

 

কূটনৈতিক এই শিষ্টাচারমূলক সাক্ষাতে ভারতের নিম্নকক্ষ লোকসভার স্পিকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সফরের সাদর আমন্ত্রণ জানান হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।

 

এই আমন্ত্রণকে দুই দেশের সংসদীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্মানজনক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিদের পারস্পরিক এই আদান-প্রদান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় গণতান্ত্রিক চর্চার মূল সৌন্দর্যকে আরও প্রস্ফুটিত করবে।

 

একই সঙ্গে হাইকমিশনার বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর সমৃদ্ধ ও বর্ণিল অভিজ্ঞতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, স্পিকারের এই প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা বাংলাদেশের চলমান সংসদীয় গণতন্ত্রকে এক নতুন ও মর্যাদাপূর্ণ উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

 

স্পিকারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও বেশ কিছু আঞ্চলিক, কৌশলগত ও মানবিক বিষয় নিয়ে গভীর মতবিনিময় হয়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল সমগ্র অঞ্চলের জন্য একটি বড় মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট হিসেবে বিবেচিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দ্রুত, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন ইস্যু।

 

পাশাপাশি, দুই দেশের মধ্যে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন আরও মজবুত করার বিষয়েও উভয় পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

 

বৈঠককালে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন গণতান্ত্রিক উত্তরণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সময়ের পরিক্রমায় এই সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে নানা টানাপোড়েন, রাজনৈতিক পালাবদল ও উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে।

 

বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলের দিকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত করে স্পিকার অত্যন্ত খোলামেলা ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন যে, ২০০৮ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে সাজানো, প্রশ্নবিদ্ধ ও একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন ও পদদলিত করা হয়েছিল।

 

তবে সম্প্রতি ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব, রক্তক্ষয়ী ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে আবারও প্রকৃত গণতন্ত্রের পথ সুগম হয়েছে বলে তিনি ভারতীয় দূতকে স্পষ্টভাবে অবহিত করেন।

 

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের রূপরেখা কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে স্পিকার অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, বলিষ্ঠ ও যুগান্তকারী একটি রূপরেখা প্রদান করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অতীতের মতো দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক এখন আর কেবল সরকারকেন্দ্রিক বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে কোনোভাবেই চলবে না।

 

বরং এখন থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করে প্রকৃত অর্থেই একটি ‘জনগণকেন্দ্রিক’ বা সাধারণ মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের একটি শক্ত ও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।

 

স্পিকারের এই অত্যন্ত বাস্তবসম্মত, দূরদর্শী ও সময়োপযোগী বক্তব্যের সঙ্গে পূর্ণ সমর্থন ও একাত্মতা প্রকাশ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি স্পিকারকে আশ্বস্ত করে বলেন, ভারত সরকারও বর্তমানে কেবল রাজনৈতিক বা সরকারি স্তরে নয়, বরং দুই দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সুদৃঢ়, সম্মানজনক ও টেকসই সম্পর্ক নির্মাণের বিষয়টিকে তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।