মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকার সচিবালয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সেক্রেটারি অ্যান্ডা ফিলিপের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সৌজন্যমূলক বৈঠকে তিনি এই কথা জানান।
এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই বৈঠকটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিগত বছরগুলোতে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর যে অপরিসীম ত্যাগ ও অবর্ণনীয় সংগ্রাম রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই শীর্ষ প্রতিনিধির সামনে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ও দৃঢ় কণ্ঠে উল্লেখ করেন যে, দেশে জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনার এই দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনে তার দলের অগণিত নিরপরাধ নেতা-কর্মী গুম, হত্যা ও চরম রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে প্রায় চল্লিশ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
তবে এতসব প্রতিকূলতা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সত্ত্বেও গত ১২ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ও সর্বজনীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ গণতান্ত্রিক ধারাকে পুনরায় সুগম করা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি আইপিইউ সেক্রেটারিকে অবহিত করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক এই প্রতিনিধিকে আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কেবল বহুদলীয় গণতন্ত্রই নয়, বরং সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণও মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) হাত ধরেই সূচিত হয়েছিল।
বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনায় এখনো বেশ কিছু কাঠামোগত ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ অবশিষ্ট রয়েছে বলে তিনি অকপটে স্বীকার করেন। তবে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তার নেতৃত্বাধীন সরকার গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সম্পূর্ণ ও দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই দেশের টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তিনি প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সরকারের মূল লক্ষ্যই হলো প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার অক্ষুণ্ন রাখা এবং জনকল্যাণমূলক সেবাগুলো মানুষের দোরগোড়ায় নির্বিঘ্নে পৌঁছে দেওয়া। আইপিইউ সেক্রেটারি অ্যান্ডা ফিলিপ বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও গতিশীল নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশনগুলোতে খোদ প্রধানমন্ত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি তার ব্যক্তিগত ও দলীয় অঙ্গীকারের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
আন্তর্জাতিক এই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান যে, তিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারটি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পাঠ ও বিশ্লেষণ করেছেন। ইশতেহারে উল্লেখিত শিক্ষা খাতের যুগান্তকারী বিভিন্ন উদ্যোগ এবং তৃণমূল পর্যায়ের কমিউনিটিভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো তাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করেছে।
বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নতুন অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, তা যদি নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকে, তবে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পাশাপাশি, গণতন্ত্রকে আরও বেশি কার্যকর, অর্থবহ ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে তৃণমূল পর্যায়ে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও আইপিইউ সেক্রেটারি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠকে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুস্পষ্টভাবে জানান যে, নারীদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে নারীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে স্নাতক (অনার্স) পর্যায় পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে শিক্ষা প্রদান এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উপবৃত্তি চালুর মতো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা তিনি আন্তর্জাতিক এই প্রতিনিধিকে জানান।
এছাড়া, সরকারের অন্যতম উদ্ভাবনী প্রকল্প ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মূল উদ্দেশ্য যে কেবল সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা নয়, বরং এর মাধ্যমে নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং পারিবারিক ও সামাজিক যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা, সেটিও তিনি অত্যন্ত সুচারুভাবে ব্যাখ্যা করেন।
সবশেষে, ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের মধ্যকার বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতা আগামী দিনে আরও জোরদার ও নিবিড় করার বিষয়ে অ্যান্ডা ফিলিপ গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন।
পূর্ব আফ্রিকার দেশ তানজানিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য আইপিইউর আসন্ন ১৫৩তম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকারের সম্ভাব্য ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক এই সংসদীয় জোটের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক এক নতুন ও শক্তিশালী মাত্রায় পৌঁছাবে বলে তিনি প্রবল আশা প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্যমণ্ডিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং শামা ওবায়েদও উপস্থিত ছিলেন।