বুধবার জাতীয় সংসদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, জাতীয় আকাশসীমার সার্বিক সুরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান সামরিক সক্ষমতা ও অবকাঠামোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
একই সঙ্গে তিনি দেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন, দেশীয় প্রযুক্তিতে ড্রোন নির্মাণ, সাইবার হুমকি মোকাবিলা এবং দুর্যোগের পূর্বাভাস ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক মান অর্জনে সরকারের চলমান বহুমুখী কার্যক্রমের চিত্র আইনসভার সামনে বিশদভাবে উপস্থাপন করেন।
সংসদের নির্ধারিত অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহফুজা হান্নানের এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রী দেশের আকাশ প্রতিরক্ষার কৌশলগত গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী সমগ্র দেশের আকাশসীমা অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি রাজধানী এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিমানবাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সর্বদা কার্যকর ও প্রস্তুত রাখা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্ত।
তিনি আরও বলেন, একটি নতুন ও স্বতন্ত্র বিমানঘাঁটি কিংবা রানওয়ে নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের মতো সীমিত আয়তনের একটি দেশে ভূমির সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় নিয়ে কেবল প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা রানওয়ে তৈরি করা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।
ফলে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাকে যুগোপযোগী করে সেগুলোর সর্বোচ্চ দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস সংক্রান্ত চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী একটি তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
তিনি স্বীকার করেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা ও পৌনঃপুনিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক মানে বাংলাদেশ আবহাওয়া পূর্বাভাসে পিছিয়ে রয়েছে-এমন ধারণাকে তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বর্তমানে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যের সাহায্যে দুর্যোগ আসার পাঁচ থেকে দশ দিন আগেই নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস প্রদানে সক্ষম। ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি কিংবা বজ্রপাতের মতো দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রদানে সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ককে আরও বিস্তৃত ও নিখুঁত করতে নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণ এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতের প্রযুক্তিগত রূপান্তর নিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের আধুনিক সামরিক রূপরেখার কথা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, সমসাময়িক বিশ্বের বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও ডিজিটাল ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আধুনিক যুগের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা উপাদান হিসেবে ড্রোন প্রযুক্তির গুরুত্ব স্বীকার করে তিনি জানান, সম্পূর্ণ দেশীয় সক্ষমতায় মনুষ্যবিহীন আকাশযান বা ড্রোন উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি দেশের বিশাল সমুদ্রসীমা ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের নিরাপত্তা সুসংহত করতে বঙ্গোপসাগরে নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অসামরিক কার্যক্রমে সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণের আইনি ভিত্তি সংক্রান্ত সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সাংবিধানিক ও আইনি বিধান সুস্পষ্ট করেন।
তিনি বলেন, বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচনের সময় সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষা এবং ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’ নির্দেশিকার আওতায় যেকোনো জাতীয় দুর্যোগ বা সংকটে বেসামরিক প্রশাসনকে সরাসরি সহায়তা প্রদান করে সশস্ত্র বাহিনী।
এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৯ ধারা অনুযায়ী জনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রয়োজনীয় আইনি এখতিয়ার প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং যেকোনো জাতীয় প্রয়োজনে আইনি পরিধির মধ্যে থেকেই সশস্ত্র বাহিনী সার্বক্ষণিক দেশ ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।