শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আহত বৃদ্ধার মর্মান্তিক মৃত্যু

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম

প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আহত বৃদ্ধার মর্মান্তিক মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় এক বৃদ্ধা প্রাণ হারিয়েছেন। শুক্রবার সকালে জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীকে বহনকারী একটি সরকারি গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই নারীর মৃত্যু হয়।

 

দেশের একটি অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক মহাসড়কে ঘটা এই অপ্রত্যাশিত ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি স্থানীয় জনমনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভিআইপি চলাচলের সময় সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও এই মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে।

 

নিহত ওই বৃদ্ধার নাম ফিরোজা বেগম। ষাট বছর বয়সী এই নারী শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক ইউনিয়নের অন্তর্গত গোপীনাথপুর গ্রামের মৃত নিজাম উদ্দিনের স্ত্রী। শুক্রবার সকাল আনুমানিক নয়টার দিকে মোকামতলা-জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের গোপীনাথপুর এলাকায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়।

 

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী এবং প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিহত নারী কানে কম শুনতেন বা শ্রবণপ্রতিবন্ধী ছিলেন। যার ফলে রাস্তা পারাপারের সময় দ্রুতগামী গাড়ির শব্দ তিনি সম্ভবত শুনতে পাননি বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

 

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী একটি সরকারি সফরে ঢাকা থেকে তার নিজস্ব সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা জয়পুরহাট-২ আসনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিলেন। প্রতিমন্ত্রীর এই সরকারি গাড়িবহরটি বগুড়ার শিবগঞ্জ এলাকার মোকামতলা-জয়পুরহাট সড়ক অতিক্রম করার সময় গোপীনাথপুর নামক স্থানে পৌঁছালে অনাকাঙ্ক্ষিত এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।

 

পথচারী ফিরোজা বেগম যখন রাস্তা পার হচ্ছিলেন, তখন তাকে বাঁচাতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রীর গাড়িটি আকস্মিকভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, গাড়িটি বৃদ্ধাকে সজোরে ধাক্কা দেওয়ার পর সড়ক থেকে ছিটকে গিয়ে পাশের একটি নিচু ধানের ক্ষেতে পড়ে যায়।

 

এই দুর্ঘটনার সময় সরকারি ওই গাড়িতে প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীর সঙ্গে তার সহধর্মিণীও অবস্থান করছিলেন। গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়ার ফলে প্রতিমন্ত্রী নিজেও শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মীরা দ্রুততার সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন।

 

সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি তার পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যস্থলের দিকে রওনা হয়ে নিজ বাসভবনে ফিরে যান।

 

অন্যদিকে, গাড়ির ধাক্কায় গুরুতরভাবে আহত বৃদ্ধা ফিরোজা বেগমকে উদ্ধার করতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ অত্যন্ত মানবিক ও ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। স্থানীয়দের দ্রুত সহায়তায় তাকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে বগুড়ার স্বনামধন্য টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

 

সেখানে তাকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয় এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল তার জীবন বাঁচানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শুক্রবার দুপুর আনুমানিক পৌনে বারোটা থেকে বারোটার মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বৃদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

এই স্পর্শকাতর দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে এবং হাসপাতালে উপস্থিত হন। শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুজ্জামান গণমাধ্যমের কাছে দুর্ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

 

তিনি জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মহাসড়কে সাধারণ যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা কবলিত গাড়িটি উদ্ধারের প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়।

 

পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করেছেন। তিনি জানান, নিহত ফিরোজা বেগমের মরদেহ বর্তমানে টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশের সুরক্ষিত হেফাজতে রাখা হয়েছে।

 

নিহতের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যরাও মর্মান্তিক এই সংবাদ পেয়ে ইতিমধ্যে হাসপাতালে এসে উপস্থিত হয়েছেন। পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে নিহতের স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

পরিবারের সদস্যদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করার পরেই মরদেহ হস্তান্তরসহ পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

একটি সরকারি সফরে থাকা উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গের গাড়িবহরের সঙ্গে সাধারণ পথচারীর এই ধরনের দুর্ঘটনা স্বভাবতই অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো যেমন কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মানবিকতা, নিরপেক্ষতা এবং বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখে, ঠিক তেমনি এই ঘটনার প্রতিটি দিক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

 

একদিকে যেমন একজন নিরীহ পথচারীর অকাল মৃত্যুতে ওই এলাকায় এক গভীর শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গের যাতায়াতের সময় সাধারণ মানুষের সড়ক পারাপার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপনের পাশাপাশি পুরো ঘটনার একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা। এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ভবিষ্যতে মহাসড়কগুলোতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আরও কার্যকর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে।