শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত রুখে দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত রুখে দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সময়ে আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে, বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার যে গভীর অপচেষ্টা চলছে, তা কঠোরভাবে রুখে দিতে দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, একটি নির্দিষ্ট ও চিহ্নিত মহল সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার এবং পরিস্থিতি ঘোলাটে করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে কোনোভাবেই যেন বিন্দুমাত্র সাম্প্রদায়িক উসকানি বা বিদ্বেষ ছড়িয়ে সমাজের দীর্ঘদিনের লালিত শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করা না যায়, সে বিষয়ে প্রতিটি নাগরিককে সর্বোচ্চ সজাগ দৃষ্টি রাখার ও দায়িত্বশীল আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মতে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপতথ্যের বিস্তার রোধ করা যেকোনো সরকারের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ও পবিত্র ধর্মীয় উৎসব জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক বিশেষ ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

 

দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সম্মানিত পুরোহিত ও সেবাইতদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সম্মানী বিতরণের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

 

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দেশের চলমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর অত্যন্ত সাবলীল ও বিস্তারিত আলোকপাত করেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক রূপান্তর ও কাঠামোগত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আবারও প্রকৃত গণতন্ত্রের অভিযাত্রা শুরু হয়েছে।

 

বিগত সময়ের ভঙ্গুর অর্থনীতি, গভীরভাবে বিভাজিত ও দলীয়করণ হওয়া প্রশাসন এবং চরম অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটিয়ে এখন পুরো দেশ পুনর্গঠনের পালা। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, একটি আধুনিক রাষ্ট্র ও সুস্থ সমাজে সবসময়ই বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও মতাদর্শের মানুষের মেলবন্ধন থাকে।

 

আর এই পারস্পরিক সহাবস্থানই মূলত একটি বৈচিত্র্যময়, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের প্রকৃত সৌন্দর্য এবং শক্তির প্রধান উৎস। সমাজের প্রচলিত ‘সংখ্যালঘু’ ও ‘সংখ্যাগুরু’ ধারণার বিষয়ে একটি ভিন্ন, সময়োপযোগী ও গভীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।

 

তিনি বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানে যারা নিজেদের সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু হিসেবে বিবেচনা করে মানসিকভাবে সংকুচিত বা উদ্দীপ্ত হচ্ছেন, তারা যদি ইউরোপ কিংবা আমেরিকার মতো উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোতে সফরে যান, তবে সেখানে কিন্তু আমরা সবাই জাতিগতভাবে তথাকথিত সংখ্যালঘু হিসেবেই পরিগণিত হব।

 

বর্তমান বিশ্বায়নের এই যুগে, যেখানে পুরো পৃথিবী একটি বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে, সেখানে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু-এমন সংকীর্ণ পরিচয় আসলে কোনো মানুষের মুখ্য বিষয় হতে পারে না।

 

তাই এই ধরনের বিভাজনের মানসিকতা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে দল, মত, ধর্ম বা বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে আসুন আমরা সবাই নিজেদের শুধুই ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে গর্বের সঙ্গে পরিচয় দিতে শিখি।

 

রাষ্ট্র এবং সমাজের কোনো স্তরেই ধর্ম বা বর্ণের কারণে যেন কোনো মানুষের মধ্যে বৈষম্য, বঞ্চনা বা বিভেদের অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি না হয়, সেই গভীর উপলব্ধি থেকেই দেশের আপামর জনসাধারণকে ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

 

একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সেই বৃহত্তর ও মহৎ লক্ষ্য পূরণের অংশ হিসেবেই বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে নানামুখী যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

 

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধার্থে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কৃষক কার্ড, ক্রীড়াঙ্গনের বিকাশের জন্য স্পোর্টস কার্ড এবং সমাজের নৈতিক পথপ্রদর্শক হিসেবে সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানজনক ভাতা প্রদানের মতো জনকল্যাণমুখী উদ্যোগগুলো অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

 

সরকারের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের কথা বিস্তারিত বর্ণনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান প্রশাসন এমন একটি আদর্শ জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর, যেখানে রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বৈষম্য ছাড়াই সব নাগরিককে তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও সহায়তা প্রদান করবে।

 

এর বিপরীতে, দেশের সম্মানিত নাগরিকরাও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের সকল সাংবিধানিক, আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। মূলত রাষ্ট্র, সরকার এবং নাগরিকদের মধ্যে এই অবিচ্ছেদ্য পারস্পরিক আস্থা, গভীর দায়িত্ববোধ ও গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে আমাদের সবার কাঙ্ক্ষিত সেই স্বপ্নের কল্যাণ রাষ্ট্র বা কল্যাণ বাংলাদেশ।

 

এই রাষ্ট্র ও সমাজের নিরন্তর উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কোনো একজন ব্যক্তিও যেন কোনোভাবেই পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণরূপে অঙ্গীকারবদ্ধ। আর এই বিশাল ও ঐতিহাসিক কর্মযজ্ঞ সফল করতে হলে প্রয়োজন প্রতিটি স্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ ও সার্বিক সহযোগিতা।

 

তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এই পবিত্র ভূখণ্ড আপনার, আমার এবং আমাদের সবার। পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, একজন স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এই দেশে সবার অধিকার একেবারেই সমান।

 

নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস, রীতিনীতি ও সংস্কৃতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরাপদভাবে জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। বর্তমান সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ এবং একই সঙ্গে ‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার’। এই সর্বজনীন নীতির ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে বলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।