এই উদ্দেশ্যে কার্যকর ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, রাত্রিকালীন দৃষ্টি সহায়ক প্রযুক্তি এবং তাপীয় সংবেদনশীল ড্রোন মোতায়েন করার সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত শহর সিলেটে নবনির্মিত ‘সীমান্ত স্কুল অব সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড ড্রোন ওয়ারফেয়ার’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি রাষ্ট্রের এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের কথা জানান।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি এবং দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে এই বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও এর সার্বিক কার্যক্রমের সূচনাকে তিনি একটি অনন্য ও যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সরকারের উন্নয়ন দর্শন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে বলেন যে, একটি মেধানির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক এবং প্রযুক্তিসমৃদ্ধ আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করাই বর্তমান প্রশাসনের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য।
নির্বাচনী ইশতেহার এবং রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার ও টেকসই মেরামতের যে দৃঢ় অঙ্গীকার জনগণের সামনে ব্যক্ত করা হয়েছিল, জাতীয় নিরাপত্তার আধুনিকায়ন তারই অন্যতম প্রধান একটি স্তম্ভ। বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি স্বনির্ভর ও সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে দেশের সকল শৃঙ্খলা বাহিনী এবং জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল প্রযুক্তির পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।
যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রথাগত প্রতিরক্ষা কাঠামোর বাইরে গিয়ে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি সময়োপযোগী সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলাই এই রূপান্তরের মূল উদ্দেশ্য।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর নিরাপত্তাঝুঁকি এবং তা মোকাবিলার আধুনিক কৌশল বিশদভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, ভৌগোলিক জটিলতা ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে অনেক সীমান্ত এলাকায় চব্বিশ ঘণ্টা শারীরিক টহল অব্যাহত রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে থার্মাল ড্রোন ও অত্যাধুনিক সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সীমান্তের ওপারে প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী ও যেকোনো ধরনের গতিবিধি স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এই সার্বক্ষণিক নজরদারি ব্যবস্থা দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করবে।
বিশেষ করে সীমান্ত পথে সংঘটিত অবৈধ মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধমূলক কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অনেক বেশি সহজ ও নির্ভুল হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে উপস্থিত অতিথিদের সামনে অত্যাধুনিক এই ড্রোন প্রযুক্তির একটি সফল ও বাস্তবমুখী মহড়াও সরাসরি প্রদর্শন করা হয়। ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জোর দিয়ে বলেন, কেবল প্রযুক্তি সংগ্রহ করলেই চলবে না, বরং সেই প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ মানের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা অপরিহার্য।
সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই নবনির্মিত এই বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই বিদ্যালয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ দেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সার্বক্ষণিক নজরদারি ও ড্রোন যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মানের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
তবে সরকারের লক্ষ্য কেবল সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের পরিসর আরও সম্প্রসারিত করা হবে এবং বেসামরিক তরুণ জনবলকেও আধুনিক প্রযুক্তির এই কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক বিজ্ঞান ও আকাশযান প্রযুক্তির এমন কার্যকর সংমিশ্রণ দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় সীমান্তকে যেকোনো ধরনের বহিঃশত্রু ও চোরাকারবারির হাত থেকে অক্ষত রাখার পাশাপাশি এই উদ্যোগ সমগ্র দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে।