সৈকতের অত্যন্ত সংবেদনশীল বালিয়াড়ি বা প্রাকৃতিক বালুর স্তূপের ওপর দিয়ে চলমান একটি বিতর্কিত সড়ক নির্মাণকাজ অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী আট সপ্তাহের জন্য এই নির্মাণকাজের ওপর সম্পূর্ণ আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর সকালে বিচারপতি জেবিএম হাসান এবং বিচারপতি আজিজ আহমদ ভুঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা আবেদনের পুঙ্খানুপুঙ্খ শুনানি শেষে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন।
পরিবেশবাদী সংগঠন ও সচেতন নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিধ্বনি হিসেবেই এই রায়কে বিবেচনা করা হচ্ছে। আদালত কক্ষে এই স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ওপর বিশদ আইনি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে দায়ের করা আবেদনের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করেন দেশের সুপরিচিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। অন্যদিকে, দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মিনহাজুল হক চৌধুরী।
রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানিতে উপস্থিত থেকে আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিন পক্ষের যুক্তিতর্ক ও আইনি ব্যাখ্যার পর হাইকোর্ট বালিয়াড়িতে যেকোনো ধরনের কাঠামোগত বা কৃত্রিম হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এই কঠোর স্থগিতাদেশ জারি করেন।
এই আইনি প্রক্রিয়ার পেছনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মূল আকর্ষণ এবং পরিবেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হলো এর নিজস্ব নিয়মে গড়ে ওঠা বালিয়াড়ি।
অথচ, এই বালিয়াড়ির ভেতর দিয়েই সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে সড়ক নির্মাণের একটি বড় ও ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এই বেআইনি নির্মাণকাজ পরিচালনার মাধ্যমে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পরিচালকসহ মোট চারজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা উচ্চ আদালতের পূর্ববর্তী সুস্পষ্ট রায় চরমভাবে অমান্য করেছেন।
তাদের বিরুদ্ধে এই আদালত অবমাননার গুরুতর অভিযোগ এনেই একটি মামলা দায়ের করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) পক্ষ থেকেও সৈকতের সামগ্রিক পরিবেশ রক্ষায় একটি পৃথক রিট আবেদন করা হয়।
আদালত উভয় আবেদনের দীর্ঘ শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি কারণ দর্শানোর রুল জারি করার পাশাপাশি আট সপ্তাহের জন্য নির্মাণকাজ সম্পূর্ণরূপে স্থগিত রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। এছাড়া, আদালত অবমাননার মূল মামলাটির কার্যক্রমও আগামী আট সপ্তাহের জন্য মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছে।
এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটে দেশের প্রথম সারির কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বেশ কিছু সচিত্র ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে। সংবাদমাধ্যমে যখন কক্সবাজারের বালিয়াড়িতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণের খবর প্রকাশিত হয়, তখন তা পরিবেশবাদী, পর্যটক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করে।
উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট ও পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কীভাবে অবাধে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রবল প্রশ্ন ওঠে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব বস্তুনিষ্ঠ খবরের ভিত্তিতেই মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) দেশের অমূল্য সম্পদ রক্ষায় জনস্বার্থে এই আদালত অবমাননার মামলাটি দায়ের করতে বাধ্য হয়।
পাশাপাশি, বেলা ওই বিধ্বংসী প্রকল্পের সব ধরনের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করার আইনি নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে কেন্দ্র করে উচ্চ আদালতের এই কঠোর অবস্থান ও আইনি হস্তক্ষেপ নতুন কোনো বিষয় নয়।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ অতীত ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে জানান যে, এর আগে ২০১১ সালেও এইচআরপিবির দায়ের করা একটি জনস্বার্থমূলক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ রুল জারি করেছিলেন।
সেই সময় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের আদি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য যেকোনো মূল্যে বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সৈকতের বালিয়াড়িতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সব ধরনের স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা অবিলম্বে অপসারণের জন্য একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করা হয়েছিল।
সেই ঐতিহাসিক নির্দেশনার আলোকে স্থানীয় প্রশাসন এর আগে অন্তত দুইবার সৈকতের বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা ও দখলদারি উচ্ছেদ করতে বাধ্য হয়েছিল। তবে অতীতের সেই কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও উচ্ছেদ অভিযানের পরেও স্থানীয় প্রশাসনের চরম উদাসীনতা ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন ভাবনার কারণে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত আজ আবারও গভীর হুমকির মুখে পড়েছে।
জানা যায়, কক্সবাজার পৌরসভা সম্প্রতি একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যার মূল উদ্দেশ্যই হলো সৈকতের অত্যন্ত সংবেদনশীল বালিয়াড়ির বুক চিরে একটি দীর্ঘ পাকা সড়ক নির্মাণ করা। পরিবেশবিদদের মতে, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে বালিয়াড়ির ভূমিকা অপরিসীম; এটি কেবল সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে প্রাকৃতিকভাবে রক্ষা করে।
এই ধরনের অপরিণামদর্শী প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সৈকতের প্রাকৃতিক গঠন চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উন্নয়ন অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত, তবে তা কোনোভাবেই দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করে নয়-টেকসই উন্নয়নের এই বৈশ্বিক নীতিগত অবস্থানের জায়গা থেকেই হাইকোর্ট এই সময়োপযোগী স্থগিতাদেশ দিয়েছেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।