এই নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, প্রয়োজনে সুদূর আফ্রিকা মহাদেশের তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ দেশগুলো থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের জোরালো সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে ‘আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলন ও বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং’ শীর্ষক এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সরকারের এই কৌশলগত ও সময়োপযোগী অবস্থানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বহুল আলোচিত রোহিঙ্গা সংকটসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, দেশের শিল্প উৎপাদন সচল রাখা এবং নাগরিক জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত।
তাই জ্বালানি সংকটকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিকল্প বাজার খুঁজছে, যাতে ভবিষ্যতের যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হয়।
আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সেখানে সরকারের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, এবারের বৈশ্বিক এই সর্বোচ্চ অধিবেশনে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং সার্বিক জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি অত্যন্ত সাবলীল ও অকপটে স্বীকার করেন যে, দীর্ঘদিনের নানা অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো কিছুটা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে রাতারাতি সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা কোনো জাদুকরী প্রক্রিয়ায় সম্ভব নয়; এর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় এবং সুপরিকল্পিত কাঠামোগত সংস্কার একান্ত প্রয়োজন।
তবে আশার কথা হলো, ইতোমধ্যে বর্তমান সরকার দেশের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছু কঠোর, সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কাঙ্ক্ষিত ও গুণগত পরিবর্তন আনার জন্য সরকার যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, সে বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই কাঠামোগত পরিবর্তনের সুফল তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।
বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং’ বা দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার একটি নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে।
বিনিয়োগের পথে থাকা দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতাগুলো সমূলে উৎপাটন করে একটি আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব কাঠামো গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে বলেও তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।
এছাড়া আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অবৈধ অভিবাসন রোধ এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সরকারের অত্যন্ত দৃঢ় ও আপসহীন অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী অবৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে সরকার কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে এবং এ নিয়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার কারণে সৃষ্ট মানবিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সংকট বর্তমানে আরও ঘনীভূত ও জটিল আকার ধারণ করেছে বলে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সম্মানজনক, নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর জোরালো ও কার্যকর চাপ প্রয়োগ ছাড়া এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারের কাছ থেকে আদায় করা অত্যন্ত কঠিন।
এই চরম বাস্তবতাকে সামনে রেখে আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি সম্পূর্ণ আলাদা ও বিশেষ সেশন বা অধিবেশনের আয়োজন করা হবে। ওই বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশ তার ওপর আপতিত মাত্রাতিরিক্ত ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি বিশ্বনেতাদের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে এবং মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির জন্য সর্বোচ্চ কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।