শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোবাইল ফোন ও সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত আসক্তি মাদকের মতোই ধ্বংসাত্মক : আইজিপি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

মোবাইল ফোন ও সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত আসক্তি মাদকের মতোই ধ্বংসাত্মক : আইজিপি
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।

 

তিনি বলেছেন, মাদকাসক্তি যেমন একটি সম্ভাবনাময় জীবনকে ধ্বংস করে দেয়, ঠিক তেমনি মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট গেম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাত্রাতিরিক্ত আসক্তিও তরুণদের জন্য সমপরিমাণ ক্ষতিকর।

 

শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের বাংলাদেশ পুলিশ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থায়নে এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এসএসসি, এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের মেধাবী সন্তানদের মাঝে এই বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

 

আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির তাঁর বক্তব্যে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর জোর না দিয়ে শিক্ষার্থীদের মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার উদাত্ত আহ্বান জানান। মেধাবী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজকে যে সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে, সেটি কেবল একটি সাধারণ পুরস্কার নয়।

 

এটি শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রম ও মেধার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। একই সঙ্গে এটি আগামী দিনের সম্ভাবনাময় তরুণদের প্রতি পুলিশ প্রশাসনের গভীর বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক। মেধা মানুষকে জীবনের পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে, কিন্তু একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে মহান করে তোলে তার সততা, মানবিকতা এবং সুদৃঢ় নৈতিক মূল্যবোধ।

 

তাই শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করলেই হবে না, বরং দেশ ও দশের কল্যাণে নিবেদিত একজন ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চরিত্রে বিনয়, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, কঠোর শৃঙ্খলা এবং গভীর দেশপ্রেম ধারণ করার পরামর্শ দেন তিনি।

 

আইজিপি অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, শিক্ষার্থীদের আজকের এই অসামান্য কৃতিত্ব আগামী দিনের একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

 

তরুণ সমাজকে বিপথগামী হওয়ার হাত থেকে রক্ষায় পুলিশ প্রধান অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেন। তিনি বলেন, বয়সের স্বাভাবিক কৌতূহল অথবা পারিপার্শ্বিক কোনো অশুভ প্ররোচনায় পড়ে মাদকের ভয়াল থাবা যেন কোনোভাবেই তরুণদের স্পর্শ করতে না পারে, সে বিষয়ে সর্বদা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 

মাদক একটি নিশ্চিত মরণফাঁদ, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে চরম ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান যুগে প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য হলেও সেটি যেন আসক্তিতে পরিণত না হয়।

 

প্রযুক্তিকে মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হবে, প্রযুক্তি যেন কোনোভাবেই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যাপারে তরুণ সমাজকে অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে। এছাড়া একজন দায়িত্বশীল ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে দেশের প্রচলিত সব আইনকানুন যথাযথভাবে মেনে চলার পাশাপাশি সমাজের অন্যান্য মানুষকেও আইন মানতে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান তিনি।

 

বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন। তিনি তাঁর সমাপনী ও সভাপতির বক্তব্যে কৃতী শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রেখে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

 

সব ধরনের খারাপ কাজ ও নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিরত রেখে দেশ ও সাধারণ জনগণের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান তিনি। শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

 

অনুষ্ঠানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ উপস্থিত শিক্ষার্থীদের আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, জীবনে সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হলে নিরলস পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

 

উন্নতি করতে হলে নিরন্তর ও ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তিনি ডিজিটাল পর্দায় সময় ব্যয় কমানোর মাধ্যমে পড়াশোনায় আরও বেশি ও গভীর মনোনিবেশ করার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান। এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন এআইজি মো. ইসমাইল হোসেন।

 

অনুষ্ঠানে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে নিজেদের অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেন কাজী মো. তানান হোসেন, সৈয়দা সাবিহা মুশাররাত মুমু, মো. আদনান জাওয়াদ এবং মুস্তাইনা মঞ্জুর। মেধাবী এই শিক্ষার্থীরা তাদের বক্তব্যে আগামী দিনে দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণে সততার সঙ্গে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

 

পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের মেধার মূল্যায়নে এমন একটি প্রশংসনীয় ও উৎসাহব্যঞ্জক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তারা বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসন ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

 

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত ডিআইজি শম্পা ইয়াসমিন এবং পুলিশ পরিদর্শক শেখ ফারুকুজ্জামান। তারা সন্তানদের সাফল্যের পেছনে নিজেদের ত্যাগ এবং পুলিশ বাহিনীর এমন অনুপ্রেরণাদায়ী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

 

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে মোট দুই হাজার ১১৩ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে এই সম্মানজনক মেধাবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৮০১ জন এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ২৭২ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন।

 

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৮৪৫ জন এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ১৯৫ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তির জন্য মনোনীত হয়েছেন। শনিবার রাজারবাগের মূল অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় অবস্থানরত ৩৬০ জন কৃতী শিক্ষার্থীর হাতে বৃত্তির অর্থ ও সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

 

মনোনীত বাকি শিক্ষার্থীদের সম্মাননা ও বৃত্তি তাদের নিজ নিজ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মাধ্যমে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের গর্বিত অভিভাবক এবং বিপুলসংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন, যা পুরো আয়োজনকে এক উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে পরিণত করে।