রবিবার, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম

দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
ছবি: সংগৃহীত

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, দূষণমুক্ত এবং বাসযোগ্য পরিবেশ রেখে যাওয়ার লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

রোববার সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলোর দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

 

ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নের প্রভাবে রাজধানী ঢাকার চারপাশের প্রাণপ্রকৃতি আজ চরম হুমকির সম্মুখীন। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, বালু এবং শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ পরিস্থিতি দীর্ঘকাল ধরেই পরিবেশবিদ ও সাধারণ মানুষের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে আয়োজিত রোববারের পর্যালোচনা সভাটি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। সভায় নদীগুলোর দূষণ নিয়ন্ত্রণ, তলদেশে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ, নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

 

একই সঙ্গে রাজধানীর চারপাশে বিদ্যমান বৃত্তাকার নৌপথের উন্নয়নসংক্রান্ত চলমান কার্যক্রমের সার্বিক দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হয়। নদীগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন খাল ও পয়োনিষ্কাশন নালাগুলোর দূষণ রোধেও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

 

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে কেবল সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় দায়িত্ব হলো আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়া।

 

এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল আইন প্রয়োগ বা সরকারি নির্দেশনার মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের জাগরণ। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো কেবল ভৌগোলিক উপাদান নয়, এগুলো এ দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

তাই নদীগুলোকে বাঁচাতে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। ইতোপূর্বে নদীগুলোর দূষণ রোধ ও নাব্যতা রক্ষায় যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন সরকারপ্রধান।

 

এ ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর বিশেষ তাগিদ দেন। অনেক সময় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবে বৃহৎ প্রকল্পগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে।

 

এই অচলায়তন ভাঙতে এবং প্রতিটি প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দপ্তরকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তার এই নির্দেশনার ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিভিন্ন নদী রক্ষা প্রকল্প নতুন করে গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি উপস্থিত থেকে নিজ নিজ দপ্তরের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।

 

এছাড়া নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামও এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেন।

 

সরকারের নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি এই সভায় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঢাকা নৌ অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আব্দুল্লাহ-আল-মাকসুস সভায় তাদের পেশাদার মতামত প্রদান করেন।

 

নদীগুলোর তীরবর্তী বৃহৎ তিন নগরী-ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এই পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত থেকে নদী রক্ষায় সরকারের নতুন ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন।

 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে আয়োজিত এই বৈঠক ঢাকার চারপাশের মৃতপ্রায় নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

 

জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাংলাদেশ পরিবেশ রক্ষায় কতটা আন্তরিক, তার একটি বড় প্রমাণ হতে পারে ঢাকার নদীগুলোর সফল পুনরুদ্ধার। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে-এই চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে আগামী দিনগুলোতে নদীদূষণ রোধে সরকার আরও কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং সাধারণ জনগণও তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে বলেই সচেতন মহলের প্রত্যাশা।