এর অংশ হিসেবে অচিরেই প্রতিটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় কিউআর কোড এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা যুক্ত হতে যাচ্ছে। নতুন এই নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো চালকদের কর্মসংস্থান অক্ষুণ্ন রেখে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একটি নিবন্ধন নম্বরের বিপরীতে অবৈধভাবে একাধিক রিকশা চালানোর প্রবণতা চিরতরে বন্ধ করা।
একই সঙ্গে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর লেড-এসিড ব্যাটারির ব্যবহার নিষিদ্ধ করে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারির প্রচলন এবং নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক চলাচলের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এক জরুরি নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সরকারের এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।
সোমবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধিতে মনোযোগ আকর্ষণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ নোটিশ উত্থাপন করেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু।
তিনি রাজধানীর যানজট নিরসনে ১৭টি সিগন্যালে বসানো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর ৫০টি ট্রাফিক ক্যামেরার সুফল এবং এর বিপরীতে অটোরিকশার কারণে সৃষ্ট বহুমুখী সংকটের কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তিনি আইনপ্রণেতাদের জানান, এআই ট্রাফিক ক্যামেরা চালুর পর সড়কে লাল বাতি অমান্য করা বা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর মতো গুরুতর অনিয়ম উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো প্রচলিত কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রধান সড়কগুলোতেও বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে।
কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রায়ই এসব বাহন ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এসব যানের কোনো বৈধ নম্বর প্লেট না থাকায় এআই ক্যামেরায় এদের অনিয়ম শনাক্ত হলেও কোনো ধরনের জরিমানা বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হওয়ায় এসব বাহন একেবারে বন্ধ না করে দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তন, নম্বর প্লেট সংযোজন এবং চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের আওতায় আনার জন্য তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সংসদ সদস্যের উত্থাপিত এই নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ব্যাটারিচালিত যানের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি বিস্তৃত চিত্র সংসদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি স্বীকার করেন যে, গত এক দশকে ইজি বাইকসহ ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক যানগুলো গ্রামীণ ও নগর পরিবহন ব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
এর মাধ্যমে চালক, গ্যারেজ কর্মী ও যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ীসহ বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাত, সড়ক নিরাপত্তা এবং পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ হুমকিতে রূপ নিয়েছে।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমানে সারাদেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ গ্রাস করছে। এর বিপরীতে দেশজুড়ে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র তিন হাজার তিনশটি।
অন্যদিকে, কেবল রাজধানী ঢাকাতেই প্রায় ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে প্রতি বছর সরকারের প্রায় চার হাজার কোটি টাকার বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
পরিবেশগত বিপর্যয় ও সড়ক নিরাপত্তার চরম অবনতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব রিকশায় ব্যবহৃত ক্ষতিকারক লেড-এসিড ব্যাটারির অনিরাপদ রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার কারণে নির্গত সিসা ও বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাস, মাটি ও পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে, যা আশপাশের পোল্ট্রি শিল্প ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে।
সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি জানান, ২০২৫ সালে দেশে সংঘটিত ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই সরাসরি দায়ী ছিল অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নিয়মিত অভিযান, প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধকরণ এবং ডেসকো ও ডিপিডিসির যৌথ অভিযানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চলমান আইনি পদক্ষেপগুলোর কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
পাশাপাশি যানজট নিরসনে তেজগাঁও ও রমনা বিভাগে আরও ২০০টি এআই ক্যামেরা বসানোর কাজ চলমান রয়েছে বলেও তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিস্তারিত বক্তব্যের পর সম্পূরক প্রশ্নের সুযোগ নিয়ে সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্ট করেন।
তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, তিনি রিকশা নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন, বরং একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ চান। প্রতিদিন কেবল ঢাকাতেই অন্তত ৩০০টি নতুন অটোরিকশা যুক্ত হওয়া এবং এদের চার্জিংয়ে প্রতিদিন এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচের তথ্য তুলে ধরে তিনি একে বর্তমান লোডশেডিংয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বাহন ডাম্পিং বা পুলিশের হয়রানি বন্ধ করে এগুলোকে ভেতরের গলিপথে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া, সৌরবিদ্যুৎ-ভিত্তিক চার্জিং স্টেশন স্থাপন, বিআরটিএ নিবন্ধন এবং এলাকাভিত্তিক জোনিং ব্যবস্থা দ্রুত চালুর প্রস্তাব দেন তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেন যে, স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ইতিমধ্যেই একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই নীতিমালায় চালকদের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রেখেই কিউআর কোড, ট্র্যাকিং সিস্টেম ও পরিবেশবান্ধব ব্যাটারির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও সিটি কর্পোরেশনের অসাধু কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি জাতীয় স্বার্থ ও জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই আধুনিক নীতিমালার পূর্ণ বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।