বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিবিড় আলোচনার বরাত দিয়ে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, বর্তমান লোডশেডিং পরিস্থিতি একান্তই একটি সাময়িক সমস্যা।
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। তবে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই সংকটের কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে বলে সরকার গভীরভাবে প্রত্যাশা করছে।
বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রশাসনিক ও কারিগরি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলেও তিনি সংবাদ মাধ্যমকে অবহিত করেন। রাজধানী ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং লোডশেডিং বিষয়ে সরকারের বর্তমান কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন এই উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ঢাকায় শিল্পকারখানা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের পরিধি সর্বাধিক। জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখার বৃহত্তর স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে এই মহানগরী প্রথাগতভাবেই কিছুটা কৌশলগত অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে।
তবে রাষ্ট্রীয় সমতার নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করে বর্তমান জাতীয় সংকটের এই কঠিন সময়ে রাজধানীর নাগরিকদেরও কিছুটা লোডশেডিং মেনে নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, ঢাকাকে পুরোপুরি লোডশেডিংমুক্ত রাখা হবে-সরকারের পূর্ববর্তী এমন একপেশে নীতি থেকে বর্তমান প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে সরে এসেছে।
এর ফলশ্রুতিতে, দেশের অন্যান্য প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রতি সংহতি জানিয়ে রাজধানীতেও এখন সুনির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় লোডশেডিং বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই সমবণ্টন নীতির মাধ্যমে মূলত শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যুৎ সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা করার একটি যুগান্তকারী প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের পূর্ববর্তী পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলেও দেশে ব্যাপক মাত্রায় লোডশেডিংয়ের অস্তিত্ব ছিল।
কিন্তু সে সময় নিছক রাজনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে রাজধানী ঢাকাকে সম্পূর্ণ অন্যায্যভাবে লোডশেডিংয়ের আওতামুক্ত রাখা হয়েছিল। এর পেছনের মূল কারণ হিসেবে তিনি ঢাকার নাগরিকদের তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী আর্থসামাজিক অবস্থান, নাগরিক সুবিধার প্রতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং গণমাধ্যমে জোরালো মতপ্রকাশের ক্ষমতার কথা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেন।
তিনি এই অবস্থাকে ‘সামাজিক পুঁজি’ বা সোশ্যাল ক্যাপিটাল হিসেবে আখ্যায়িত করেন। দীর্ঘদিন ধরে লোডশেডিংয়ের চরম বাস্তবতার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকায় ঢাকার বাসিন্দাদের মনস্তত্ত্বে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে এক ধরনের বিশেষ ও অবাস্তব ধারণা তৈরি হয়েছিল। বর্তমান প্রশাসনের ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক নীতির কারণে দীর্ঘদিনের সেই ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটতে শুরু করেছে বলে তিনি মনে করেন।
২০২৩ ও ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন গড় লোডশেডিংয়ের তুলনামূলক চিত্র
| মাস | ২০২৩ সালের গড় লোডশেডিং (মেগাওয়াট) | ২০২৬ সালের গড় লোডশেডিং (মেগাওয়াট) |
| জুন | ৯৬৯ | ৭৪১ |
| জুলাই | ৬১৩ |
৪৬০ |
বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ বছর ২০২৩ এবং বর্তমান ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন মাসগুলোর জাতীয় গ্রিডের উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোর তুলনায় বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।
পরিসংখ্যানগত এই বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিতরণে পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি যৌক্তিক ভারসাম্য ও কারিগরি সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও নীতিনির্ধারকদের উদ্ধৃত করে তথ্য উপদেষ্টা পুনরায় আশ্বস্ত করেন যে, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ চেইনের বর্তমান সাময়িক প্রতিবন্ধকতাগুলো কেটে গেলেই দেশের সব কটি উৎপাদন কেন্দ্র পুনরায় তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিরে যাবে।
বর্তমান সরকার দেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সাময়িক এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সরকার দেশের আপামর জনসাধারণের সর্বোচ্চ সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ধৈর্য একান্তভাবে প্রত্যাশা করছে।