সোমবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের জ্বালানি সংকট বিগত সরকারের ভুল নীতি ও দুর্নীতির চরম পরিণতি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম

দেশের জ্বালানি সংকট বিগত সরকারের ভুল নীতি ও দুর্নীতির চরম পরিণতি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বর্তমান তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের মূল কারণ হিসেবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অদূরদর্শিতা, আত্মঘাতী নীতি এবং গুটিকয়েক স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ীর প্রতি তোষণনীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।

 

তিনি অভিযোগ করেছেন, পূর্ববর্তী প্রশাসন দেশীয় জ্বালানি সম্পদের যথাযথ অনুসন্ধান ও উন্নয়নে সম্পূর্ণ অবহেলা করে কেবল বিদেশনির্ভর নীতির ওপর জোর দিয়েছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দলীয় সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীদের হীন স্বার্থরক্ষা করা।

 

তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এই ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে দেশকে টেনে তুলতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।

 

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদীয় অধিবেশনে এক বিশেষ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন।

 

তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপসাগরীয় সংকটের মতো এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দেয়।

 

তা সত্ত্বেও দেশের সাধারণ কৃষক সমাজের স্বার্থ বিবেচনা করে এবং বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার জ্বালানি তেলের দাম এক পয়সাও বৃদ্ধি করেনি।

 

পরবর্তীতে মূলত সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার রোধ করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতেই বাধ্য হয়ে তেলের দাম সহনীয় মাত্রায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেন বৃদ্ধি না পায়, সেজন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর নতুন করে কোনো কর আরোপ না করার বিষয়ে সরকার অত্যন্ত সচেষ্ট রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

 

দেশের ক্রমবর্ধমান এলএনজি ঘাটতি মেটাতে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকারের সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী পরিকল্পনার কথা সংসদে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, সমুদ্রে ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপন করা সাধারণত একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হলেও বর্তমান সরকার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।

 

চীনের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ের বা জি-টু-জি চুক্তির আওতায় কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে আগামী আঠারো মাসের মধ্যে তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি মাতারবাড়িতে একটি ভূমিনির্ভর স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণেরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

 

এসব প্রকল্প থেকে দেশের মূল ভূখণ্ডে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস সরবরাহের জন্য কয়েক শ কিলোমিটার দীর্ঘ অত্যাধুনিক পাইপলাইন স্থাপনের মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে এর জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

 

অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রসঙ্গেও সালাউদ্দিন আহমদ সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, দেশীয় কয়লার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বড়পুকুরিয়ার কয়লা ব্যবহার করে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন।

 

পাশাপাশি বর্তমানে চালু থাকা কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিকায়নের কাজও চলমান রয়েছে। বৈশ্বিক আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের নানা বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও, পূর্ববর্তী চুক্তির ধারাবাহিকতায় পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দ্বিতীয় পর্যায়ের বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শুরু করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা এগিয়ে চলছে।

 

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইনের কোনো ঘাটতি দেখা দিলে সরকার নিজস্ব তহবিল থেকেই তা নির্মাণ করে দেবে। জ্বালানি খাতের বহুমুখীকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার অংশ হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং এলপিজি ব্যবহারের প্রসারে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথাও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

 

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিগত বছরগুলোতে দেশের স্থলভাগ বা সমুদ্রসীমায় নতুন কোনো গ্যাসকূপ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েই সর্বত্র নতুন কূপ খনন এবং ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করেছে।

 

ইতোমধ্যে ভোলায় গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ সচল করা হয়েছে এবং সেখানে প্রাপ্ত গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে নতুন সার কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দেশে এলপিজির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে মাতারবাড়িতে একটি সুবিশাল এলপিজি টার্মিনাল ও মজুত অবকাঠামো নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

এমনকি সমুদ্রের চরম বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও যাতে জাহাজ থেকে নিরাপদে গ্যাস খালাস করা যায়, সে লক্ষ্যে একটি বিদেশি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাসমান সিবিএস প্রযুক্তিনির্ভর টার্মিনাল স্থাপনের আলোচনা এখন একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

 

বক্তব্যের শেষাংশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে একটি চরম ভঙ্গুর, দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিশৃঙ্খল আর্থিক এবং জ্বালানি ব্যবস্থা হাতে পাওয়ার পর রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন করা বেশ কঠিন। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাত্র ছয় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তনের যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, তা ইতোমধ্যে সফলভাবে কার্যকর হতে শুরু করেছে।

 

সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো কেবল প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে কয়লা, বায়ু, সৌরশক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির এক সুষম সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি দুর্যোগ-সহনশীল ও টেকসই জ্বালানি খাত গড়ে তোলা।

 

এর ফলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং ভবিষ্যতে কোনো শিল্পকারখানা বা বিদ্যুৎ খাতকে জ্বালানি সংকটের মতো বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে না বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।