বিগত কয়েকদিন ধরে দেশজুড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই গুরুতর আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত।
দেশের আপামর জনসাধারণকে এই প্রাণঘাতী মশাবাহিত রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখতে এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে নানামুখী আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন।
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী দেশের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সামাজিক সংগঠন ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে তিনি মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন।
ডা. এম এ মুহিত জানান, আসন্ন এই জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় দেশজুড়ে তিন মাসব্যাপী এক বিশাল জনসচেতনতামূলক অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। এই কার্যক্রমে শুধুমাত্র সরকারি সংস্থাই নয়, বরং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিক সমাজকেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এডিস মশার প্রজননস্থল সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ বসতবাড়ি, আঙিনা এবং কর্মস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সুদৃঢ় সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা নিধন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে জোরদার করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
সরকারের কৌশলগত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান লক্ষ্য মূলত দুটি- প্রথমত, সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কার্যকরভাবে কমিয়ে আনা এবং দ্বিতীয়ত, এই রোগে মৃত্যুর হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।
এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দেশব্যাপী প্রায় তিন হাজার চিকিৎসককে ডেঙ্গু রোগের আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা প্রটোকল বিষয়ে বিশেষ পুনঃপ্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
চিকিৎসা সেবার সার্বিক মান উন্নত করতে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও পর্যায়ক্রমে এই নিবিড় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, যাতে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষও সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা থেকে কোনোভাবেই বঞ্চিত না হন।
আসন্ন ডেঙ্গুর চরম অবনতিশীল সময়ে দেশের হাসপাতালগুলোতে যাতে কোনোভাবেই চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি দেখা না দেয়, সে বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। রোগীদের জন্য শয্যা, জীবন রক্ষাকারী স্যালাইন এবং রোগ নির্ণয়ের কিটের সম্ভাব্য সংকট এড়াতে ইতোমধ্যে ব্যাপক ও নিশ্ছিদ্র আগাম প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর যে হার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সে অনুযায়ী সরকারি ভাণ্ডারে পর্যাপ্ত পরিমাণ ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট এবং শিরায় পুশ করার স্যালাইনের মজুত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য নির্ধারিত বিশেষ শয্যাগুলোও ইতোমধ্যে পুরোপুরি চালু করা হয়েছে।
যদি রোগীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তবে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে অন্যান্য সাধারণ ওয়ার্ডের শয্যাগুলোকে দ্রুততার সঙ্গে পুনর্বিন্যাস করে তা ডেঙ্গু রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসায় ব্যবহার করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু সরকারি হাসপাতালই নয়, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকেও ডেঙ্গুর এই আসন্ন সর্বোচ্চ প্রকোপের সময়ে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।
তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় আহ্বান জানিয়েছেন যে, জাতীয় এই দুর্যোগ মুহূর্তে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে অবশ্যই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় অগ্রণী ও মানবিক ভূমিকা পালন করতে হবে।
একই সঙ্গে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার অজুহাতে কোনোভাবেই রোগীদের চিকিৎসায় অযৌক্তিকভাবে ব্যয় বাড়ানো চলবে না এবং প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সুনির্দিষ্ট সংখ্যক শয্যা আবশ্যিকভাবে সংরক্ষিত রাখতে হবে। সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার্থে স্বাস্থ্য খাতের সকল স্তরের সমন্বিত ও মানবিক প্রচেষ্টাই পারে ডেঙ্গুর এই আসন্ন ভয়াবহতাকে সফলভাবে রুখে দিতে।