নতুন একটি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ থেকে সর্বমোট দশ হাজার দক্ষ কর্মী নিয়োগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে ওমান সরকার। এই বিপুল সংখ্যক কর্মীর মধ্যে পাঁচ হাজার জন কৃষি খাতে এবং অবশিষ্ট পাঁচ হাজার জন মৎস্য শিকার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা ও প্রাথমিক সমঝোতা সম্পন্ন হয়। কূটনৈতিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ওমানের রাজপরিবারের সম্মানীয় সদস্য আল সাইয়্যেদ মোহাম্মদ সেলিম আলী আল সাইদের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ প্রতিনিধি দল বুধবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে এক ফলপ্রসূ সাক্ষাৎ ও বৈঠকে মিলিত হন।
এই সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ও গঠনমূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এই যুগান্তকারী চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে, ওমানের কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের অত্যন্ত নিবিড় আলোচনা হয়েছে এবং এর ফলশ্রুতিতেই এই দশ হাজার কর্মী নিয়োগের বিষয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ রূপরেখা সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিস্তারিতভাবে জানান যে, কর্মী নিয়োগের সার্বিক প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আগামী মাসে ওমানের একটি বিশেষ কারিগরি প্রতিনিধি দল পুনরায় ঢাকা সফর করবে।
ওই গুরুত্বপূর্ণ সফরে তারা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসবেন এবং কর্মী নিয়োগের সমস্ত শর্তাবলি ও পদ্ধতি চূড়ান্ত করবেন। এর মাধ্যমে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বাংলাদেশি কর্মীদের ওমানে গমনের পথ সুগম হবে বলে দৃঢ়ভাবে আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ওমানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের প্রবেশাধিকার বন্ধ থাকার বিষয়টি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। ওমানের ভিসা প্রদান প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর বিষয়ে বর্তমান সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, সে প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ ইসলাম অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, বিগত সরকারের শাসনামলে সৃষ্ট বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত কারণ ও পদ্ধতিগত জটিলতায় ওমানের ভিসা প্রদান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তবে বর্তমান সরকার অত্যন্ত জোরালোভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, যাতে করে বাংলাদেশি কর্মীরা আবারও নিয়মিত প্রক্রিয়ায় ওমানে গিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ সরকার এখন কেবল অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ রপ্তানির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করছে।
ওমান সরকারকেও এই বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে যে, বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীরা ওমানের বিভিন্ন উদীয়মান শিল্প ও সেবা খাতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এই প্রস্তাবে ওমান সরকারও যথেষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং উভয় দেশই দক্ষ মানবসম্পদ আদান-প্রদানের বিষয়ে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।
এদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, বৈঠকে বাংলাদেশ ও ওমানের মধ্যকার বিরাজমান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও কীভাবে বহুমুখী ও শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে বিশদ পর্যালোচনা করা হয়েছে।
এই আলোচনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ওমানের সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারটি পুনরায় সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করা। বৈঠকে উপস্থিত ওমানের রাজপরিবারের সদস্য আল সাইয়্যেদ মোহাম্মদ সেলিম আলী আল সাইদ ওমানের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের নিরলস ও মূল্যবান অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা আরও বহুগুণ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে, যা কাজে লাগাতে উভয় রাষ্ট্রকেই উদ্যোগী হতে হবে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বিশ্লেষকদের মতে, ওমানের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
একই সঙ্গে, কৃষি ও মৎস্য শিকারের মতো সুনির্দিষ্ট ও বিশেষায়িত খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতির দক্ষ জনশক্তি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের এক অনন্য সুযোগ লাভ করবে।
এই দশ হাজার কর্মীর সফল নিয়োগ আগামী দিনে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশগুলোতেও বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।