বুধবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাদুঘর পরিদর্শনে রাষ্ট্রপতি

‘গণতন্ত্র ফিরে পেলেও মূল্য দিতে হয়েছে অনেক বেশি’

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম

‘গণতন্ত্র ফিরে পেলেও মূল্য দিতে হয়েছে অনেক বেশি’
ছবি : Collected

দীর্ঘ ষোলো বছরের চরম স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে দেশে অবশেষে গণতন্ত্র ফিরে এলেও এর জন্য জাতিকে এক বিশাল ও মর্মান্তিক মূল্য চোকাটে হয়েছে বলে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, রাজধানীর বুকে নবনির্মিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ পরিদর্শনকালে এক আবেগঘন ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে তিনি এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। রাষ্ট্রপ্রধান অত্যন্ত আক্ষেপ ও বেদনার সঙ্গে স্মরণ করেন যে, দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে ছাত্র-জনতা যে অসামান্য আত্মত্যাগ করেছেন, রাষ্ট্র কখনোই সেই অকুতোভয় শহীদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের অমূল্য ঋণ পুরোপুরি শোধ করতে পারবে না।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নিরিখে রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্য সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দায়বদ্ধতা ও সংবেদনশীলতার এক স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

এদিন বিকেলে সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে জাদুঘর প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি। সাধারণ দর্শনার্থীদের মতোই নির্ধারিত নিয়ম মেনে টিকিট সংগ্রহ করে তিনি ‘লংওয়াক-টু-ডেমোক্রেসি’ বা দীর্ঘ গণতান্ত্রিক যাত্রার বিশেষ পথ ধরে জাদুঘরের মূল অংশে প্রবেশ করেন।

 

সেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার নানা রক্তস্নাত ঐতিহাসিক ধাপের চিত্র গভীরভাবে অবলোকন করেন তিনি। বিশেষ করে বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের বিভীষিকাময় স্মৃতি বিজড়িত কুখ্যাত ‘আয়নাঘর’-এর অবিকল রেপ্লিকা, পিলখানার মর্মান্তিক বিডিআর হত্যাযজ্ঞ, রাতের আঁধারে শাপলা চত্বরের নির্মম হত্যাযজ্ঞ, জোরপূর্বক গুমের শিকার হওয়া মানুষদের নিয়ে সাজানো বিশেষ অংশ এবং রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর চালানো পৈশাচিক নির্যাতনের নানা ভয়াল সামগ্রী ঘুরে দেখার সময় তিনি বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

 

শহীদদের স্বহস্তে লেখা শেষ চিঠি, রক্তমাখা ব্যবহৃত পোশাক এবং অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন দেখার পর জুলাই জাদুঘরের আধুনিক মনসুন থিয়েটারে অভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। ছাত্র-জনতার ওপর চালানো নির্মম দমন-পীড়নের সেই প্রামাণ্যচিত্র দেখে রাষ্ট্রপতি প্রকাশ্যেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।

 

অশ্রুসিক্ত নয়নে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে আর কোনো দিন যেন এমন মর্মান্তিক ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে দলমত নির্বিশেষে সমগ্র জাতিকে সর্বদা সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।

 

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে অন্তরে গভীরভাবে ধারণ করে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন, সর্বজনীন ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন দেশের প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব।

 

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস যথাযথভাবে ও সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় তুলে ধরতে এই ধরনের অত্যাধুনিক স্মৃতি সংরক্ষণ উদ্যোগ এবং জাদুঘরের ঐতিহাসিক ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে তিনি জোরালো মত প্রকাশ করেন।

 

পাশাপাশি তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সকল শহীদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং যে সকল অকুতোভয় যোদ্ধা পঙ্গুত্ব বরণ করে বা গুরুতর আহত হয়ে এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তাদের দ্রুত আরোগ্য ও সার্বিক কল্যাণ প্রার্থনা করেন।

 

দেশ পুনর্গঠনের এই ঐতিহাসিক ও ক্রান্তিকালীন অধ্যায়ে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ও আত্মোৎসর্গকারী বীর ছাত্র-জনতার নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ সমগ্র জাতি চিরকাল গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে বলে রাষ্ট্রপতি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

শহীদ পরিবারের স্বজনদের এবং আহতদের অসীম ত্যাগ ও সাহসের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি তাদের প্রতি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। পরিদর্শন পর্বের শেষাংশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের অম্লান স্মৃতির প্রতি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদন করে জাদুঘর প্রাঙ্গণে একটি স্মৃতিময় বৃক্ষরোপণ করেন তিনি।

 

সবশেষে তিনি জাদুঘরের পরিদর্শন বইয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের গভীর অনুভূতি ব্যক্ত করে স্বাক্ষর করেন। এই ঐতিহাসিক ও আবেগপূর্ণ পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

 

তাদের মধ্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম এবং প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ-উর-রহমান উল্লেখযোগ্য।

 

এছাড়াও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালকসহ রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত থেকে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হন।

 

জাদুঘরটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার কারিগর, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি, আবরার ইলিয়াস এবং মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধও এই ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন।