বুধবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভোলাতে গড়ে তোলা হবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা - সংসদে প্রধানমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

ভোলাতে গড়ে তোলা হবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা - সংসদে প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

দ্বীপ জেলা ভোলার বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী কৌশলগত পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। মূল ভূখণ্ডে গ্যাস সরবরাহের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ লাইন নির্মাণের অপেক্ষায় না থেকে, সরাসরি ভোলাতেই বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সার কারখানা এবং একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

 

বুধবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের এই নতুন ও সমন্বিত রূপরেখা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক প্রতিবেদনের আদলে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

 

সংসদীয় অধিবেশনে মহিলা আসন-সতেরো এর সদস্য সুলতানা আহমেদের একটি সম্পূরক প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলার গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ লাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে গ্যাস নিয়ে আসার যে প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল, তার বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছর সময় প্রয়োজন।

 

এই দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে সরকার বিকল্প এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদকে নিশ্চিত করেন যে, ভোলাতেই যাতে বিপুল পরিমাণ গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন করা যায়, সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে।

 

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তারা সেখানে আধুনিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয়ে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে এই মূল্যবান প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন দ্বীপ জেলাটিতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে, অন্যদিকে ঠিক তেমনিভাবে পুরো অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতির আকারও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

 

ভোলার এই গ্যাস সম্পদকে দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণে ও জাতীয় স্বার্থে সর্বোত্তম ব্যবহারের একটি বিশদ পরিকল্পনা তুলে ধরে সরকারপ্রধান জানান, সেখানে একটি অত্যন্ত বড় আকারের সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দেশের কৃষিখাতে সারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এই কারখানাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

এর পাশাপাশি ঠিক একই স্থানে পাঁচ শত মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন আরও একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, এই বৃহৎ প্রকল্পগুলো দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়িত হলে ভোলার অমূল্য গ্যাস সম্পদের সর্বোচ্চ ও পরিকল্পিত ব্যবহার সুনিশ্চিত হবে।

 

অধিবেশনের অন্য এক পর্যায়ে ভোলা-চার আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলামের একটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন দর্শনের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি উল্লেখ করেন যে, সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি বিশেষ কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে।

 

আগামী জুলাই ২০২৬ থেকে শুরু হয়ে জুন ২০৩১ সাল পর্যন্ত মেয়াদি এই পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

 

দ্বীপ জেলা ভোলার অনন্য আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য, বিপুল স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ, সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক চাহিদা, উপকূলীয় জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলোকে অত্যন্ত গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়েই এই সমন্বিত মহাপরিকল্পনাটি সাজানো হচ্ছে।

 

ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদকে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার কাজে ব্যবহারের বিষয়ে সংসদে আরও কিছু সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের কথা জানানো হয়। সরকার ভোলা জেলায় সম্পূর্ণ নতুন একটি চার শত মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে।

 

এর পাশাপাশি ভোলার ভেদুরিয়া ও ইলিশা গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন ষাট লাখ ঘনফুট গ্যাসকে তরলীকৃত করে বিশেষ নৌযানের মাধ্যমে খুলনার বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহের একটি অভিনব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

 

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই প্রকল্পগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে ভোলার গ্যাসের যেমন সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে, তেমনি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাও আরও সুদৃঢ় হবে।

 

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে জাতীয় অর্থনীতিতে সমুদ্র ও উপকূলীয় সম্পদের কার্যকর অবদান বাড়ানোর ওপর জোর দেন। এই বিশেষ বিন্যাসে ভোলাকে একটি অনন্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

 

নতুন এই কৌশলগত কাঠামোর অধীনে ভোলা জেলা এবং এর আশেপাশের দ্বীপগুলোকে সুনীল অর্থনীতির কেন্দ্রীয় অঞ্চলের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় জাতীয় অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা রূপালী সম্পদ ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, উপকূলীয় বিস্তৃত চরাঞ্চলে সমন্বিত ও আধুনিক কৃষির বিকাশ, জলবায়ু সহনশীল ও সুরক্ষিত টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ এবং সামগ্রিক নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

 

ভোলার বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান, সমৃদ্ধ গ্যাস ক্ষেত্র, অত্যন্ত উর্বর কৃষিজমি এবং বিপুল উপকূলীয় মৎস্যসম্পদের কথা বিবেচনায় রেখে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর সরকার যে জোর দিয়েছে, তার ফলে আগামী দিনে এই দ্বীপ জেলার সার্বিক অর্থনীতিতে এক নতুন ও অভাবনীয় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।